গিটার হাতে চট্টগ্রামের আজিজ বোর্ডিং থেকে শুরু হয়েছিল জেমসের সংগীতযাত্রা। ফারুক মাহফুজ থেকে তিনি হয়ে উঠেছেন ‘নগর বাউল’ ও ভক্তদের প্রিয় ‘গুরু’। চার দশকের বেশি সময় ধরে বাংলা রকসংগীতে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করা এই শিল্পী সম্প্রতি কথা বলেছেন সংগীতের ভবিষ্যৎ, নতুন প্রজন্ম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও শিল্পের প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে।
নওগাঁয় জন্ম হলেও জেমসের বেড়ে ওঠা চট্টগ্রামে। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই সংগীতের প্রতি তাঁর গভীর টান তৈরি হয়। একসময় বাবার সঙ্গে অভিমান করে গিটার হাতে ঘর ছাড়েন তিনি। আশ্রয় নেন চট্টগ্রামের আজিজ বোর্ডিংয়ে। সেখান থেকেই শুরু হয় সংগীতজীবনের নতুন অধ্যায়।
পরে বন্ধুদের নিয়ে গড়ে তোলেন ব্যান্ড ‘ফিলিংস’। ঝাঁকড়া চুল, স্বতন্ত্র কণ্ঠ ও গিটার বাজানোর নিজস্ব ধরন দিয়ে দ্রুতই পরিচিত হয়ে ওঠেন জেমস। দীর্ঘ সংগীতজীবনে একের পর এক জনপ্রিয় গানের মাধ্যমে পেয়েছেন শ্রোতাদের ভালোবাসা।
জন্মদিন সাধারণত ঘটা করে উদযাপন করেন না জেমস। তবে বিশেষ দিন উপলক্ষে রাজধানীর পূর্বাচলের একটি ক্লাবে সময় কাটান তিনি। সেখানে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সংগীতের পরিবর্তনশীল ধারা নিয়ে কথা বলেন এই শিল্পী।
‘মানুষের এখন পুরো একটি ট্র্যাক শোনারও ধৈর্য নেই’
সংগীতের ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা সংশয় প্রকাশ করলেও নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের প্রতিভা নিয়ে প্রশ্ন নেই জেমসের। তাঁর মতে, প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে গান তৈরি ও শোনার অভ্যাসও বদলে যাচ্ছে।
জেমস বলেন, ‘এ পর্যন্ত যত গান তৈরি হয়েছে, যদি নতুন কোনো গান নাও তৈরি হয়, তবু মানুষ আগামী ২০ বছর অনায়াসেই সেগুলো শুনতে পারবে। আর এখন যেহেতু গান স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে চলে গেছে, তাই এটি খুব সহজেই পাওয়া যাচ্ছে। যা বিনামূল্যে পাওয়া যায়, মানুষের তার প্রতি আকর্ষণ কমে যায়। মানুষের এখন পুরো একটি ট্র্যাক শোনারও আর ধৈর্য নেই।’
প্রযুক্তির পরিবর্তন মেনে নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর ভাষায়, ‘পরিবর্তন মেনে নিতে হবে। এআই এখন নিজেই কোড লিখছে, ফলে আলাদা কোডারদের প্রয়োজনীয়তা কমে আসছে। কিন্তু কোনো শিল্পরূপ বিলুপ্তির পথে থাকলেও তা প্রায়শই ভালোবাসা ও আবেগের কারণেই টিকে থাকে।’
‘লাভের কথা ভেবে গান তৈরি করা যায় না’
জেমসের কাছে সংগীত শুধু পেশা নয়, আবেগ ও ভালোবাসার জায়গা। শিল্পচর্চার মূল প্রেরণা নিজের ভেতরের তাগিদ হওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে জেমস বলেন, ‘যা-ই করা হোক না কেন, তা পুরোপুরি আবেগ ও ভালোবাসা থেকেই করতে হবে। লাভের কথা ভেবে গান তৈরি করা যায় না। যদি প্রাকৃতিকভাবে কিছু আসে, তবে তা ভালো, কিন্তু আপনি যদি লাভের আশা নিয়ে কোনো শিল্পকলা শুরু করেন, তবে আপনাকে হতাশ হতে হবে।’
নতুন প্রজন্মের সংগীতশিল্পীদের প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রতিও ইতিবাচক জেমস। তিনি বলেন, ‘এখন তো এআই-এর যুগ। তরুণ সংগীতশিল্পীরা যদি সুন্দর কাজ তৈরির জন্য এআই বা নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে, তবে অবশ্যই তা করা উচিত। ভালো কোনো নতুন প্রযুক্তি গ্রহণে কোনো দোষ নেই।’
‘সংস্কৃতি নদীর মতো’
গান মানুষের আনন্দ, অনুভূতি ও প্রকাশের মাধ্যম—এমনটাই মনে করেন জেমস। তাই মানুষ কোথায় বা কীভাবে গান গাইবে, তা নিয়ে অযথা বাধা দেওয়ার পক্ষপাতী নন তিনি।
জেমস বলেন, ‘গান তৈরি হয় মানুষের শোনার ও গাওয়ার জন্য। মানুষ যেখানে খুশি বাজারে কিংবা নদীর ঘাটে গান গাইবে। কারোই এতে বাধা দেওয়া উচিত নয়। সংস্কৃতি নদীর মতো—একে তার নিজস্ব গতিতে বইতে দেওয়া উচিত।’
সমাজের অনিয়ম বা অসংগতি নিয়ে শিল্পীদের কথা বলার অধিকার রয়েছে বলেও মনে করেন তিনি। তবে সেটি ব্যক্তির নিজস্ব উপলব্ধি ও সচেতনতা থেকে হওয়া উচিত বলে মনে করেন এই শিল্পী।
নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে জেমস বলেন, ‘আমি একজন বিনোদনকর্মী; আমি সমাজ বদলাতে আসিনি। আমি মানুষকে আনন্দ দিতে এসেছি।’
তবে সমাজের কল্যাণে প্রত্যেকের নিজ নিজ জায়গা থেকে ভালো কিছু করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। তাঁর ভাষায়, ‘সবার জন্য ভালো করার মতো এমন বড় বড় চিন্তা করার চেয়ে যদি প্রত্যেকে নিজের ও নিজের আশপাশের মানুষের ভালো করার চেষ্টা করে, তবে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই সমাজের কল্যাণ হবে।’
প্রতিবেদকের নাম 


























