পঞ্চগড়ের বোদায় নির্মাণের মাত্র দুই মাসের মাথায় একটি গার্ডার ব্রিজের দুই পাশের সংযোগ সড়ক ধসে পড়েছে। প্রায় ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতুটির নির্মাণকাজ চলেছে চার বছরের বেশি সময়। দুই মাস আগে যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার পর সামান্য বৃষ্টিতেই প্রায় ২০০ মিটার সংযোগ সড়ক ধসে পড়েছে।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বোদা উপজেলার ঝলই শালশিরী ইউনিয়নের ধরধরা এলাকায় টাঙ্গন নদীর ওপর নবনির্মিত সেতুটিতে গিয়ে এমন চিত্র দেখা যায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, টানা বৃষ্টি নয়, রাতের হালকা বৃষ্টিতেই সেতুর দুই পাশের সংযোগ সড়ক ভেঙে পড়েছে। এতে প্রতিদিনই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে এবং ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে স্থানীয় মানুষ ও যানবাহনকে।
এলাকাবাসীর দাবি, দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত সংযোগ সড়ক সংস্কার করে চলাচলের উপযোগী করার পাশাপাশি নির্মাণকাজের মানও যাচাই করা হোক।
নির্মাণকাজ নিয়ে স্থানীয়দের অভিযোগ
স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্মাণকাজের শুরু থেকেই প্রকল্পটি নিয়ে নানা প্রশ্ন ছিল। এর মধ্যে সেতু সংলগ্ন টাঙ্গন নদী থেকে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করে সংযোগ সড়ক ভরাটের অভিযোগও ওঠে। এ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদও প্রকাশিত হয়েছিল।
স্থানীয় ইউপি সদস্য প্রিয় নাথসহ কয়েকজন বাসিন্দা জানান, নদী থেকে বালু তুলে সড়ক ভরাটের সময় তাদের বলা হয়েছিল, এতে রাস্তা আরও মজবুত ও টেকসই হবে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক ও এলজিইডির মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের এমন আশ্বাসে তারা তখন কাজে বাধা দেননি।
তাদের দাবি, নদী থেকে তোলা নরম বালুর ওপর পর্যাপ্ত মাটি ও অন্যান্য উপকরণ না দিয়ে দ্রুত হেরিংবোন বন্ড (এইচবিবি) সড়ক নির্মাণ করায় এখন সেটি ধসে পড়েছে।
উদ্বোধনের উদ্যোগও হয়েছিল
স্থানীয়দের অভিযোগ, সেতুটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তাদের অভিযোগের মুখে তা আর উদ্বোধন করা হয়নি। স্থানীয় সংসদ সদস্য ও পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ সে সময় এলাকাবাসীর অভিযোগ শুনে কাজের দুরবস্থা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে এলজিইডির জেলা নির্বাহী প্রকৌশলীকে নির্দেশ দেন বলে স্থানীয়রা জানান।
ওই ঘটনার ভিডিও ও খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
স্থানীয় বাসিন্দা মফিজুর রহমান বলেন, চার বছরের বেশি সময় ধরে নির্মাণকাজ চলার পর মাত্র দুই মাস আগে সড়কটি মানুষের চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। এত অল্প সময়ের মধ্যে সামান্য বৃষ্টিতে সড়ক ধসে পড়া নির্মাণকাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় এলজিইডির তদারকি যথাযথ ছিল কি না, সেটিও তদন্ত করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
ধসের বিষয়টি স্বীকার এলজিইডির
সড়ক ধসে পড়ার বিষয়টি স্বীকার করেছে এলজিইডি।
বোদা উপজেলা সহকারী প্রকৌশলী আকরাম হোসেন বলেন, সেতুর দুই দিকের প্রায় ২০০ মিটারের এইচবিবি রাস্তা বৃষ্টিতে ভেঙে পড়েছে। ইতিমধ্যে রাস্তাটি চলাচলের উপযোগী করতে সংস্কারের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এত অল্প সময়ের ব্যবধানে রাস্তাটি এভাবে ধসে যাবে, তা তারাও ভাবেননি।
তিনি আরও জানান, নিম্নমানের কাজের পেছনে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
আকরাম হোসেন বলেন, ব্রিজের বোদা উপজেলার ধরধরা ও আটোয়ারী উপজেলার ভাটিয়াপাড়া অংশের সংযোগ সড়কটি এইচবিবির পরিবর্তে স্থায়ীভাবে কার্পেটিং করার জন্য নতুন বরাদ্দের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
তদন্তে গাফিলতি মিললে ব্যবস্থা
পঞ্চগড় এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী শফিউল ইসলাম বলেন, বিষয়টি জানার পরপরই তারা সেখানে যান চলাচল স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে এখনও চূড়ান্ত বিল দেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, তদন্তে ঠিকাদারের গাফিলতি বা কাজের নিম্নমানের প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
৫ কোটি ৯৮ লাখ টাকার প্রকল্প
প্রকল্পটির নির্মাণকাজ করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এম এস কর্পোরেশন। ৫ কোটি ৯৮ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত জনগুরুত্বপূর্ণ এই সেতু ও সংযোগ সড়ক ব্যবহারের দুই মাসের মধ্যেই ধসে পড়ায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, সাময়িক সংস্কার নয়, নির্মাণকাজের মান যাচাই করে ত্রুটির স্থায়ী সমাধান করতে হবে।
পঞ্চগড়ের দুই উপজেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য টাঙ্গন নদীর ওপর সেতুটি নির্মাণ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বোদা উপজেলার ধরধরা ও আটোয়ারী উপজেলার ভাটিয়াপাড়া এলাকার বিভিন্ন গ্রামের মানুষ ও যানবাহন চলাচল করে।
তবে নির্মাণ শেষ হওয়ার মাত্র দুই মাসের মধ্যেই সেতুটির দুই পাশের সংযোগ সড়ক ধসে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এতে যানবাহন ও পথচারীদের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রায় প্রতিদিনই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে।
প্রতিবেদকের নাম 
























