জাতীয়করণকৃত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পূর্বের চাকরিকালের ৫০ শতাংশ ‘কার্যকর চাকরিকাল’ হিসেবে গণনা করে সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের চেয়ে জ্যেষ্ঠতা দাবি করতে পারবেন না। এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।
রোববার (২৫ অক্টোবর) সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করা হয়। এর আগে গত ২ জুলাই প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ সরকারের দায়ের করা সিভিল আপিল মঞ্জুর করে এ রায় দেন।
পূর্ণাঙ্গ রায়ে আপিল বিভাগ বলেন, ২০১৩ সালের জাতীয়করণকৃত শিক্ষক বিধিমালা অনুযায়ী, জাতীয়করণের আগে অর্জিত চাকরিকালের ৫০ শতাংশ গণনার বিধানটি জাতীয়করণকৃত শিক্ষকদের নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এই বিধান ব্যবহার করে সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের ওপর জ্যেষ্ঠতা দাবি করার কোনো আইনি ভিত্তি নেই।
আদালত আরও উল্লেখ করেন, চাকরিসংক্রান্ত বিচারিক নীতি অনুযায়ী সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের জ্যেষ্ঠতা তাঁদের প্রাথমিক নিয়োগের তারিখ থেকে নির্ধারিত হবে। অন্যদিকে, জাতীয়করণকৃত শিক্ষকদের অবস্থান নির্ধারিত হবে জাতীয়করণের অব্যবহিত আগে নিয়োগবিধির অধীনে নিয়োগ পাওয়া সর্বশেষ সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকের নিচে। আপিল বিভাগের মতে, এ ব্যবস্থা বৈষম্যমূলক বা স্ববিরোধী নয়।
মামলার পটভূমি
জাতীয়করণকৃত শিক্ষকদের সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের নিচে অবস্থান নির্ধারণের বিধান এবং তাঁদের পূর্বের মতো প্রধান শিক্ষক হিসেবে গণ্য করার বিষয়টি চ্যালেঞ্জ করে বেসরকারি বিদ্যালয়ের একাংশের শিক্ষক হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন।
রিটের শুনানি শেষে হাইকোর্ট ২০১৩ সালের বিধিমালার ২(গ) বিধিকে বৈধ ঘোষণা করেন। তবে ৯(১) বিধির একটি অংশ, যেখানে জাতীয়করণকৃত শিক্ষকদের সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত সর্বশেষ শিক্ষকের নিচে রাখার কথা বলা হয়েছিল, সেটিকে আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ও বেআইনি ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে রিট আবেদনকারীদের প্রধান শিক্ষক হিসেবে গণ্য করে সে অনুযায়ী জ্যেষ্ঠতা ও সুবিধা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
পরে হাইকোর্টের ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করে সরকার। আপিল বিভাগ জাতীয়করণকৃত শিক্ষকদের জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ এবং সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের তুলনায় তাঁদের অবস্থান নির্ধারণসংক্রান্ত বিধিমালার বৈধতা বহাল রাখেন।
প্রধান শিক্ষক হিসেবে গণ্য করার দাবিও খারিজ
প্রধান শিক্ষক হিসেবে গণ্য হওয়ার দাবির বিষয়ে আপিল বিভাগ বলেন, রিট আবেদনকারীরা ২০১৩ সালের ১০ নভেম্বরের যে সরকারি আদেশের মাধ্যমে সহকারী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন, সেই আদেশ বা পরবর্তী সরকারি সিদ্ধান্তগুলো চ্যালেঞ্জ করেননি।
এ ছাড়া, ২০০৮ সালের ১৪ জুলাইয়ের পরিপত্র অনুযায়ী প্রধান শিক্ষক হিসেবে পদোন্নতি বা এমপিওভুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় বিধিবদ্ধ শর্ত—যেমন মহাপরিচালকের অনুমোদন—পূরণের কোনো দাপ্তরিক প্রমাণও তাঁরা উপস্থাপন করতে পারেননি।
আপিল বিভাগ মন্তব্য করেন, প্রয়োজনীয় সংবিধিবদ্ধ আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠিত না হলে কেবল আদেশের মাধ্যমে কাউকে প্রধান শিক্ষক হিসেবে গণ্য করার দাবি আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
এই রায়ের মাধ্যমে জাতীয়করণকৃত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পারস্পরিক জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণে পূর্বের চাকরিকালের ৫০ শতাংশ গণনার বিধান এবং সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের জ্যেষ্ঠতার অবস্থান সম্পর্কে আপিল বিভাগের অবস্থান স্পষ্ট হলো।
প্রতিবেদকের নাম 






















