আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং দেশে বাড়তে থাকা চাহিদার কারণে আমদানি ব্যয়ও বাড়ছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে জ্বালানি তেল আমদানিতে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। এক মাসের হিসাবে এই ব্যয় দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে মোট ১৩৭ কোটি ৫০ লাখ ডলারের জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়েছে। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী এর পরিমাণ প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা।
মোট আমদানির এক-পঞ্চমাংশের বেশি জ্বালানিতে
চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসে দেশে মোট পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৬৭৮ কোটি ২০ লাখ ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এই ব্যয় ৮ দশমিক ২০ শতাংশ বেশি।
এর মধ্যে শুধু জ্বালানি তেল আমদানিতেই ব্যয় হয়েছে ২০ দশমিক ২৭ শতাংশ অর্থাৎ মোট আমদানি ব্যয়ের এক-পঞ্চমাংশের বেশি।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে জ্বালানি তেল আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল ৭৫ কোটি ডলার। এক বছরের ব্যবধানে চলতি জুলাইয়ে এই ব্যয় বেড়েছে ৮৩ দশমিক ৩০ শতাংশ।
পরিশোধিত জ্বালানি আমদানিতে বড় উল্লম্ফন
আমদানির ধরন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পরিশোধিত তরল জ্বালানি বা পিওএল—যার মধ্যে পেট্রোল, ডিজেল, জেট ফুয়েল, ইঞ্জিন অয়েল ও গ্রিজ রয়েছে—আমদানিতে জুলাইয়ে ব্যয় হয়েছে ১৩৪ কোটি ৬১ লাখ ডলার।
আগের অর্থবছরের প্রথম মাসের তুলনায় পিওএল আমদানিতে ব্যয় বেড়েছে ৯৬ দশমিক ৭০ শতাংশ।
অন্যদিকে অপরিশোধিত তেল আমদানিতে ব্যয় কমেছে ৫৬ দশমিক ১০ শতাংশ। জুলাইয়ে এ খাতে ব্যয় হয়েছে ২ কোটি ৮৮ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৬ কোটি ৫৬ লাখ ডলার।
গত অর্থবছরেও ভেঙেছিল আমদানির রেকর্ড
এর আগে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে মোট ১ হাজার ৬৩ কোটি ৫০ লাখ ডলারের জ্বালানি তেল আমদানি হয়েছিল। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি। আগের অর্থবছরের তুলনায় এই আমদানি ছিল দ্বিগুণেরও বেশি।
আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক সংঘাত এবং বৈশ্বিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়াকে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাড়ছে আমদানির পরিমাণও
অর্থের পাশাপাশি জ্বালানি আমদানির পরিমাণও বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে অর্থাৎ জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত দেশে মোট ৫৭ লাখ ৪০ হাজার টন বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি আমদানি করা হয়। এর বড় অংশই ছিল সরাসরি ব্যবহারযোগ্য পরিশোধিত জ্বালানি।
দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে বর্তমানে ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি লিটার ডিজেল ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ টাকা এবং অকটেন ১৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
রিজার্ভে স্বস্তি, আমদানি ব্যয়ে বড় চাপ
জ্বালানি আমদানিতে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হলেও দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বর্তমানে এই চাপ সামাল দিতে সহায়তা করছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম-৬ হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ ৩১ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার। গ্রস রিজার্ভের পরিমাণ ৩৬ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার।
সম্প্রতি এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) ১ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলারের দায় পরিশোধের পরও এই রিজার্ভ দিয়ে সাড়ে চার মাসের বেশি সময়ের সামগ্রিক আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বিবেচনায় এটিকে সন্তোষজনক অবস্থান হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রতিবেদকের নাম 




















