টিন (TIN) সার্টিফিকেট থাকলেই আয়কর পরিশোধ করতে হবে—বিষয়টি এমন নয়। অনেক ক্ষেত্রে টিনধারীর আয় করমুক্ত সীমার মধ্যে থাকলে রিটার্ন দাখিল করতে হলেও প্রদেয় আয়কর শূন্য হতে পারে। এটিই সাধারণভাবে ‘জিরো ট্যাক্স রিটার্ন’ নামে পরিচিত।
২০২৬-২০২৭ করবর্ষের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ই-রিটার্ন ব্যবস্থা চালু করেছে। গত ২২ জুলাই থেকে নতুন করবর্ষের রিটার্ন অনলাইনে দাখিলের সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে ঘরে বসেই রিটার্ন জমা দিতে পারবেন করদাতারা।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—জিরো রিটার্ন মানে রিটার্নের সব ঘরে শূন্য বসিয়ে দেওয়া নয়। আয়, ব্যয়, সম্পদ ও দায়ের প্রকৃত তথ্যই দিতে হবে।
১. প্রথমে ই-রিটার্ন পোর্টালে নিবন্ধন
এনবিআরের নির্ধারিত ই-রিটার্ন পোর্টালে প্রবেশ করে টিন ও পাসওয়ার্ড দিয়ে লগইন করতে হবে।
প্রথমবার নিবন্ধনের ক্ষেত্রে সাধারণত প্রয়োজন হবে—
- ১২ ডিজিটের টিন
- জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি)
- এনআইডিতে বায়োমেট্রিকভাবে নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর
নিবন্ধন সম্পন্ন হলে টিন ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে পরবর্তী সময়ে পোর্টালে প্রবেশ করা যাবে।
২. ‘রিটার্ন সাবমিশন’ নির্বাচন করুন
লগইন করার পর ‘Return Submission’ অপশনে যেতে হবে। এরপর ধাপে ধাপে অ্যাসেসমেন্টের তথ্য এবং আয়ের বিভিন্ন খাত পূরণ করতে হবে।
একসঙ্গে সব তথ্য দেওয়া সম্ভব না হলে ধাপে ধাপে তথ্য পূরণ করে সেভ করে রাখা যায়। পরে আবার লগইন করে বাকি অংশ সম্পন্ন করা যাবে।
৩. আয় না থাকলেও সব ঘর শূন্য করবেন না
এখানেই অনেক করদাতা ভুল করেন। আয় নেই বা করযোগ্য আয় নেই—এমন পরিস্থিতিতেও রিটার্নের সব ঘর ফাঁকা বা শূন্য রাখা ঠিক নয়।
আপনার বাস্তব আর্থিক অবস্থার সঙ্গে মিল রেখে আয়, ব্যয়, সম্পদ ও দায়ের তথ্য দিতে হবে।
যেমন, ব্যাংক হিসাবে টাকা থাকলে, কোনো জমি-ফ্ল্যাট বা অন্য সম্পদ থাকলে কিংবা বাস্তবে কোনো ব্যয় হয়ে থাকলে সেগুলো সঠিকভাবে উল্লেখ করতে হবে।
অর্থাৎ, জিরো ট্যাক্স মানে সবকিছু শূন্য নয়; হিসাব শেষে প্রদেয় কর শূন্য হওয়াই মূল বিষয়।
৪. ২০২৬-২৭ করবর্ষে করমুক্ত সীমা কত?
২০২৬-২০২৭ করবর্ষে সাধারণ ব্যক্তি করদাতার প্রথম ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করমুক্ত।
বিভিন্ন শ্রেণির করদাতার ক্ষেত্রে করমুক্ত সীমা হলো—
- নারী ও ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী করদাতা: ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা
- প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও তৃতীয় লিঙ্গের করদাতা: ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা
- গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও গেজেটভুক্ত জুলাই যোদ্ধা: ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা
প্রতিবন্ধী ব্যক্তির মা-বাবা বা আইনানুগ অভিভাবকের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শর্তে প্রত্যেক সন্তান বা পোষ্যের জন্য করমুক্ত সীমা আরও ৫০ হাজার টাকা বাড়ানোর বিধান রয়েছে। তবে মা-বাবা দুজনই করদাতা হলে এ সুবিধা একজনই পাবেন।
৫. ‘Tax & Payment’ অংশটি যাচাই করুন
সব তথ্য দেওয়ার পর রিটার্নের হিসাব অনুযায়ী সিস্টেম প্রদেয় করের পরিমাণ দেখাবে।
প্রকৃত তথ্যের ভিত্তিতে যদি প্রদেয় কর শূন্য আসে, তাহলে সেটিই জিরো ট্যাক্স রিটার্নের পরিস্থিতি।
কোনো উৎসে কর কেটে রাখা হয়ে থাকলে বা আগে অগ্রিম কর দেওয়া থাকলে সেগুলোর তথ্যও ‘Tax & Payment’ অংশে সঠিকভাবে দিতে হবে।
৬. সাবমিটের আগে পুরো রিটার্ন যাচাই করুন
রিটার্ন জমা দেওয়ার আগে ‘Return View’ থেকে পুরো ফরমটি ভালোভাবে দেখে নিন।
বিশেষ করে যাচাই করুন—
- নাম ও টিন নম্বর
- আয়
- ব্যয়
- সম্পদের বিবরণ
- দায়
- করের হিসাব
কোথাও ভুল থাকলে সাবমিট করার আগেই সংশোধন করতে হবে।
৭. সাবমিট করলেই দাখিল সম্পন্ন
সব তথ্য সঠিক থাকলে অনলাইনে রিটার্ন সাবমিট করুন। সাবমিশন সম্পন্ন হলে অ্যাসেসমেন্টের পর Acknowledgement Slip পাওয়া যাবে। একই সঙ্গে ট্যাক্স সার্টিফিকেটও তৈরি হবে।
পরবর্তী সময়ে ট্যাক্স রেকর্ড মেনু থেকে এসব নথি দেখা, সংরক্ষণ এবং প্রয়োজন হলে প্রিন্ট করা যাবে।
৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন দিলে কী সুবিধা?
২০২৬-২০২৭ করবর্ষে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করলে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ পর্যন্ত কর প্রণোদনা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তবে জিরো ট্যাক্স রিটার্ন দাখিল করলেই ৫ শতাংশ টাকা ফেরত পাওয়া যাবে—এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। প্রণোদনার বিষয়টি ব্যক্তির করযোগ্য আয় ও প্রদেয় করের ওপর নির্ভর করবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
জিরো ট্যাক্স রিটার্ন দেওয়ার সময় আয়, সম্পদ, ব্যয় বা দায় ইচ্ছাকৃতভাবে শূন্য দেখানো যাবে না। আয় করমুক্ত সীমার নিচে থাকলেও রিটার্নে প্রকৃত তথ্য দিতে হবে।
সঠিক পদ্ধতি হলো—প্রকৃত আয়, সম্পদ, ব্যয় ও দায়ের তথ্য দিয়ে ই-রিটার্ন পূরণ করা, হিসাব শেষে প্রদেয় কর শূন্য হলে তা যাচাই করা এবং এরপর রিটার্ন সাবমিট করে অ্যাকনলেজমেন্ট স্লিপ সংরক্ষণ করা।
সংক্ষেপে: টিন থাকা মানেই কর দিতে হবে না; তবে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে। আর আয় করমুক্ত সীমার মধ্যে থাকলে সঠিক তথ্য দিয়েই জিরো ট্যাক্স রিটার্ন দাখিল করা যায়।
প্রতিবেদকের নাম 




















