ফুটবল মাঠে নেতৃত্ব, দলের ভেতরে প্রভাব এবং সিদ্ধান্তে তাঁর কথিত ভূমিকা—সব মিলিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিলিয়ান এমবাপ্পেকে নিয়ে তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত মিম-সংস্কৃতি। কখনো সামরিক পোশাকে, কখনো মাথায় টুপি, আবার কখনো সিংহাসনে বসা—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি এসব ছবিতে ফরাসি তারকাকে দেখানো হয় ‘স্বৈরশাসক’ হিসেবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় এই চরিত্রের নাম দেওয়া হয়েছে ‘ডিক্টেটর এমবাপ্পে’।
কিন্তু এই মিমের পেছনে কি শুধু হাসি-ঠাট্টা, নাকি ফুটবলে এমবাপ্পের প্রভাব নিয়ে পুরোনো আলোচনাও এর ভিত্তি তৈরি করেছে?
কোচ থেকে খেলোয়াড়—সবকিছুতেই নাকি এমবাপ্পের প্রভাব!
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মিমে এমনভাবে এমবাপ্পেকে উপস্থাপন করা হয়, যেন দলের কোচ বরখাস্ত করা থেকে শুরু করে খেলোয়াড় কেনাবেচা—সব সিদ্ধান্তই তাঁর ইচ্ছায় হয়। এমনকি সতীর্থদের পারফরম্যান্সের হিসাব নেওয়া কিংবা ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের কাছ থেকেও রিপোর্ট চাওয়ার মতো কাল্পনিক বিষয়ও মিমের অংশ হয়ে উঠেছে।
বাস্তবে এমন কোনো ক্ষমতা তাঁর রয়েছে কি না, সেটি অবশ্য ভিন্ন প্রশ্ন। তবে এমবাপ্পের প্রভাব নিয়ে আলোচনা নতুন নয়।
২০২৪ সালের ঘটনাও কি মিমের সূত্র?
‘ডিক্টেটর এমবাপ্পে’ মিমের শুরুটা ঠিক কখন, তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। তবে ২০২৪ সালের একটি ঘটনা এর পেছনে ভূমিকা রেখে থাকতে পারে।
সে সময় ফরাসি ইনফ্লুয়েন্সার ও কাবাবের দোকানের মালিক মোহাম্মদ হেন্নির বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন এমবাপ্পে। তাঁর দোকানের একটি স্যান্ডউইচের বর্ণনায় এমবাপ্পের নাম ব্যবহার করা হয়েছিল। পরে এমবাপ্পের আইনজীবীরা সেই নাম সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানান।
ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক হাস্যরসের জন্ম দেয়। এরপর থেকেই এমবাপ্পেকে এমন একজন হিসেবে তুলে ধরার প্রবণতা বাড়তে থাকে, যিনি নিজের নাম ও ভাবমূর্তির ওপর সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে চান।
পিএসজির সময় থেকেই শুরু প্রভাবের আলোচনা
ফুটবলে এমবাপ্পের কথিত প্রভাব নিয়েও বেশ আগে থেকেই আলোচনা রয়েছে। ২০২২ সালে পিএসজির সঙ্গে নতুন চুক্তির পর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছিল, খেলোয়াড় কেনাবেচা, কোচ নিয়োগ এবং ক্রীড়া পরিচালকের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁর মতামতের প্রভাব থাকতে পারে।
যদিও সে সময় এমবাপ্পে স্পষ্ট করে জানিয়েছিলেন, তিনি একজন ফুটবলারের ভূমিকার বাইরে যেতে চান না।
এরপর রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেওয়ার পর সেই পুরোনো আলোচনাই যেন নতুন মাত্রা পায়। বিশেষ করে ২০২৬ বিশ্বকাপকে ঘিরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি বিভিন্ন ভিডিও ও ছবি ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে ‘ডিক্টেটর এমবাপ্পে’ মিমও ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
মাঠে তাঁর নেতৃত্ব, সতীর্থদের সঙ্গে কথোপকথন কিংবা সাধারণ কোনো ঘটনাকেও মজা করে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যেন দলের সব সিদ্ধান্তই তাঁর নির্দেশে হচ্ছে।
এবার মিম নিয়ে মুখ খুললেন এমবাপ্পে
‘ডিক্টেটর এমবাপ্পে’ মিম নিয়ে এবার নিজেই কথা বলেছেন ফরাসি অধিনায়ক। ফ্রান্স ফুটবলকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, বিষয়টির একটি দিক তাঁর কাছে মজার। কারণ, অনেকেই যে নিছক হাসি-ঠাট্টার জন্য এসব মিম তৈরি করেন, তা তিনি বুঝতে পারেন।
তবে ইতিহাসের ভয়াবহ স্বৈরশাসকদের সঙ্গে নিজের তুলনা করাটা তাঁর কাছে অস্বস্তিকর।
এমবাপ্পের ভাষায়, ‘যারা মানুষ হত্যা করেছে, লাখো-কোটি মানুষকে দুর্ভোগে ফেলেছে, তাদের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। আমি তো জীবনে এমন কিছু করিনি।’
‘মোবুতু’ ডাক নিয়ে আপত্তি নেই
ফ্রান্স জাতীয় দলের সতীর্থ উসমান দেম্বেলের দেওয়া ‘মোবুতু’ ডাকটিকে অবশ্য আলাদাভাবে দেখেন এমবাপ্পে। সাবেক জায়ারের স্বৈরশাসক মোবুতু সেসে সেকোর নাম থেকেই এসেছে এই ডাক।
তবে দেম্বেলের এই ঠাট্টায় তাঁর আপত্তি নেই। বরং বিষয়টি নিয়ে হাসতে হাসতে এমবাপ্পে বলেন, ‘ও আলাদা কিছু। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পেয়েছে! ও তো শুধু মজা করছে।’
মিমের আড়ালে অন্য বার্তাও দেখছেন এমবাপ্পে
এমবাপ্পের মতে, ‘ডিক্টেটর এমবাপ্পে’ মিম কখনো কখনো নিছক বিনোদনের বিষয় হতে পারে। তবে এর মধ্যে মানুষের রাজনৈতিক ও মানবিক সচেতনতার ঘাটতির বিষয়টিও ফুটে ওঠে।
অর্থাৎ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের হাস্যরসের অংশ হিসেবে তৈরি এই চরিত্রকে তিনি পুরোপুরি অস্বীকার করছেন না। কিন্তু ইতিহাসের নির্মম স্বৈরশাসকদের সঙ্গে নিজের তুলনাকে তিনি স্পষ্টতই অস্বস্তিকর বলে মনে করছেন।
সব মিলিয়ে ‘ডিক্টেটর এমবাপ্পে’ এখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি জনপ্রিয় মিম। তবে এর পেছনে থাকা ফুটবলে তাঁর প্রভাব, নেতৃত্ব ও ব্যক্তিত্ব নিয়ে বিতর্ক যে সহজে থামছে না, সেটিও স্পষ্ট।
প্রতিবেদকের নাম 




















