লক্ষ্মীপুরে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে গ্যাস সংকটে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। গ্যাসের স্বল্পতার সুযোগে সিএনজিচালিত অটোরিকশার ভাড়া কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছেন চালকরা। যাত্রীদের অভিযোগ, কোনো কোনো রুটে ৫ টাকার ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ১৫ টাকা পর্যন্ত, আর ২০ টাকার ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ৫০ টাকা পর্যন্ত।
গ্যাস সংকটের কারণে শুধু গণপরিবহন নয়, বাসাবাড়িতেও ভোগান্তি বেড়েছে। দিনের বিভিন্ন সময়ে গ্যাস না থাকায় অনেক পরিবারকে অতিরিক্ত গ্যাস সিলিন্ডার কিনে রাখতে হচ্ছে। নিম্নআয়ের অনেক পরিবার বাড়তি খরচ বহন করতে না পেরে মাটির চুলায় রান্না করতে বাধ্য হচ্ছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নোয়াখালীর কেন্দুরবাগ এলাকায় গ্যাসের পাইপলাইনে লিকেজের কারণে লক্ষ্মীপুরে টানা দুই দিন গ্যাস সরবরাহ বন্ধ ছিল। এতে অনেক পরিবার রান্না করতে পারেনি। কেউ কেউ হোটেল থেকে খাবার কিনে খেয়েছেন, আবার অনেকে একাধিক বেলা শুকনো খাবার খেয়ে দিন কাটিয়েছেন।
পাইপলাইনের লিকেজ মেরামতের পর রোববার মধ্যরাত থেকে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা স্বাভাবিক হতে শুরু করলেও দিনের অর্ধেক সময় এখনো গ্যাসের চাপ কম থাকে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
শহরের সমসেরাবাদ, লামচরী, শাঁখারীপাড়া, লইয়ার্স কলোনি, মদিন উল্যাহ হাউজিং, মোবারক কলোনি, শিল্পী কলোনি, বাগবাড়ী, বাঞ্চানগর ও মজুপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সকালে গ্যাস পাওয়া গেলেও দুপুর ও বিকেলে অনেক সময় সরবরাহ থাকে না। ফলে ভোরে ঘুম থেকে উঠে রান্নাবান্নার কাজ শেষ করতে হচ্ছে গৃহিণীদের।
কিছু এলাকায় গ্যাস থাকলেও চাপ এতটাই কম যে রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে বাধ্য হয়ে অনেক পরিবার এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করছে। তবে বাড়তি খরচ বহন করতে না পেরে নিম্নআয়ের অনেক পরিবার মাটির চুলায় রান্নার ব্যবস্থা করেছে।
মজুপুর এলাকার বাসিন্দা ফরহাদ হোসেন বলেন, প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে গ্যাস সংকটে তাদের নানা ধরনের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। অনেক সময় হোটেল থেকে খাবার কিনে খেতে হয়েছে। এমনকি অতিরিক্ত খরচের কারণে গ্যাস সিলিন্ডার কেনার সামর্থ্যও হয়নি।
শাখারীপাড়া এলাকার গৃহিণী মিথিকা সাহা বলেন, গ্যাসের চাপ কম থাকায় সময়মতো রান্না করা যায় না। বাসায় অতিথি এলে তাদের আপ্যায়ন করতেও হোটেলের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
লামচরী এলাকার বাসিন্দা সাথী আক্তার ও মিলন আক্তার জানান, ফজরের আজানের পরপরই রান্না শুরু করতে হয়। দুপুরে গ্যাস না থাকায় রান্না করা খাবারও গরম করা যায় না। ফলে অনেক সময় ঠান্ডা খাবার খেতে হয়। সন্ধ্যা বা রাতে গ্যাস এলেও তখন পর্যন্ত অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়।
এদিকে গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচলেও। দালাল বাজার এলাকার বাসিন্দা মাসুদ আলম বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে চালকরা ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন। ৫ টাকার ভাড়া এখন ১৫ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। ২০ টাকার ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ৫০ টাকা পর্যন্ত।
মান্দারী এলাকার বাসিন্দা বায়েজিদ হোসেন বলেন, আগে ১০ টাকার যে ভাড়া ছিল, এখন সেটি ৩০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। গ্যাস সংকটকে কেন্দ্র করে যাত্রীদের কাছ থেকে সুযোগ বুঝে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হলেও পরে ভাড়া কমানোর কোনো প্রবণতা দেখা যায় না।
তবে সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকদের দাবি, গ্যাসের সংকটের কারণে তাদেরও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে। চালক রুবেল হোসেন ও জামাল উদ্দিন জানান, গ্যাস নিতে ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। এতে দিনের বড় একটি সময় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আবার গ্যাসের চাপ কম থাকায় চাহিদা অনুযায়ী গ্যাসও পাওয়া যাচ্ছে না।
তাদের দাবি, গ্যাসের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করা, সড়কের খারাপ অবস্থা এবং গাড়ি বিকল হওয়ার ঝুঁকি বিবেচনা করেই ভাড়া বাড়াতে হচ্ছে।
বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির লক্ষ্মীপুরের সহকারী প্রকৌশলী খোরশেদ আলম বলেন, গ্যাস সংকট শুধু লক্ষ্মীপুরে নয়, দেশের বিভিন্ন এলাকাতেই ছিল। লক্ষ্মীপুরে প্রতিদিন প্রায় ২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও গত কয়েক দিনে সরবরাহ ছিল মাত্র ২৫ থেকে ৩০ হাজার ঘনফুট।
তিনি জানান, নোয়াখালীর কেন্দুরবাগ এলাকায় পাইপলাইনে লিকেজের কারণে দুই দিন গ্যাস সরবরাহ বন্ধ ছিল। বর্তমানে পরিস্থিতি মোটামুটি স্বাভাবিক রয়েছে। খুব শিগগিরই গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির আরও উন্নতি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
প্রতিবেদকের নাম 




















