
গ্রামীণ বাংলার বিল, ডোবা ও খাল একসময় ছিল দেশি মাছের স্বর্গরাজ্য। বর্ষা শেষে সেসব জলাশয় সেচে মাছ ধরার উৎসব গ্রামজীবনের আনন্দের অংশ ছিল। সেই সময় জালে ধরা পড়ত কই, শিং, মাগুর, শোলের মতো পরিচিত মাছের পাশাপাশি এক অদ্ভুত আকৃতির মাছ—‘কটকটি’।
কোথাও একে বলা হতো চ্যাগা, কোথাও কুতকুতে, আবার কোথাও ব্যাঙ মাছ। দেখতে ব্যাঙাচির মতো এই মাছ আজ প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে দেশের অনেক অঞ্চল থেকে।
ব্যাঙাচির মতো অদ্ভুত গড়ন
কটকটি মাছের বৈজ্ঞানিক নাম Chaca chaca। আন্তর্জাতিকভাবে এটি ‘Squarehead Catfish’ নামে পরিচিত। মাথা চওড়া ও চ্যাপ্টা, শরীর সামনে মোটা আর পেছনের দিকে সরু—দেখতে প্রায় ব্যাঙাচির মতোই।
কাদামাটির রঙের কারণে এটি সহজেই পরিবেশের সঙ্গে মিশে যেতে পারে, ফলে শত্রুর চোখ এড়িয়ে লুকিয়ে থাকা সহজ হয়।
নামের পেছনের গল্প
গ্রামের মানুষের মতে, মাছটি ধরলে নড়াচড়ার সময় ‘কটকট’ ধরনের শব্দ করত। সেই শব্দ থেকেই নাম হয়েছে ‘কটকটি’। বিজ্ঞানীরাও জানান, এই প্রজাতির ক্যাটফিশ শব্দ তৈরি করতে সক্ষম—যা একটি বিরল বৈশিষ্ট্য।
ধৈর্যশীল শিকারি
এই মাছ সাধারণত কাদামাটির তলদেশে লুকিয়ে থাকে এবং ছোট মাছ বা জলজ প্রাণী হঠাৎ আক্রমণ করে শিকার করে। বাস্তুতন্ত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
দেখতে অদ্ভুত, স্বাদে অসাধারণ
দেখতে ভয়ংকর হলেও কটকটি মাছের মাংস নরম ও সুস্বাদু। ছোট কাঁটার ঝামেলা প্রায় নেই বললেই চলে। গ্রামীণ রান্নায় আলু, বেগুন ও মশলা দিয়ে এর ঝোল ছিল বেশ জনপ্রিয়।
বিপন্ন অবস্থায় কটকটি
বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য তালিকায় Chaca chaca এখন ‘Endangered’ বা বিপন্ন প্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত। অনেক এলাকায় বহু বছর ধরে এই মাছ আর দেখা যায় না।
কেন হারিয়ে যাচ্ছে?
জলাভূমি ভরাট, কৃষিতে রাসায়নিক ব্যবহার, জলাশয় শুকিয়ে ফেলা এবং বাণিজ্যিক মাছ চাষের প্রসার—সব মিলিয়ে এই দেশি প্রজাতির অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।
হারিয়ে যাচ্ছে একটি ঐতিহ্যও
কটকটি মাছ শুধু একটি প্রজাতি নয়, এটি গ্রামীণ স্মৃতি ও খাদ্যসংস্কৃতির অংশ। এর বিলুপ্তি মানে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই দেশীয় জলজ প্রাণী সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে কটকটির মতো আরও বহু প্রজাতি শুধু ইতিহাসে থেকে যাবে।
প্রতিবেদকের নাম 




















