মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের ১৫ দিন পরও জারি হয়নি প্রজ্ঞাপন
সরকারি কর্মচারীদের নতুন পে স্কেল নিয়ে অপেক্ষার যেন শেষ হচ্ছে না। মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের ১৫ দিন পেরিয়ে গেলেও এখনো প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি। ফলে নতুন বেতন কাঠামো কবে কার্যকর হবে, তা নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে কৌতূহল ও অপেক্ষা বাড়ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, নতুন পে স্কেলের বিভিন্ন বিষয় এখন চূড়ান্তভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এই প্রক্রিয়া শেষ হলে প্রজ্ঞাপনের খসড়া আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হবে। ভেটিং সম্পন্ন হওয়ার পর অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করার কথা রয়েছে।
প্রজ্ঞাপনে কেন সময় লাগছে?
জানা গেছে, অর্থ বিভাগ ইতোমধ্যে প্রজ্ঞাপনের খসড়া তৈরির কাজ এগিয়ে নিচ্ছে। সরকারি কর্মচারীদের বিভিন্ন শ্রেণি ও প্রতিষ্ঠানের জন্য পাঁচটি পৃথক বিশেষ আদেশ বা এসআরও জারি হতে পারে।
মন্ত্রিসভা মূলত নতুন পে স্কেলে কোন গ্রেডে কত বেতন-ভাতা বাড়বে, সে বিষয়ে অনুমোদন দিয়েছে। এখন বিভিন্ন শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীর ক্ষেত্রে কীভাবে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হবে, তার বিস্তারিত নির্দেশনা তৈরি করা হচ্ছে।
জনপ্রশাসনের বাইরে প্রতিরক্ষা বাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, সরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বেতন-ভাতা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার বিষয়েও পৃথক নির্দেশনা দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। এসব বিষয় সমন্বয় ও তদারকি করছে উচ্চপর্যায়ের সচিব কমিটি।
‘বাস্তবায়ন হবে কি না, প্রশ্নের সুযোগ নেই’
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানিয়েছেন, পে স্কেল বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপ যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে। তাই এটি বাস্তবায়ন হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি জানান, প্রথমে সচিব কমিটি সংশ্লিষ্ট সুপারিশগুলো পর্যালোচনা করে। এরপর তা মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পায়। এখন সেই অনুমোদিত সুপারিশ দ্রুত বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চলছে।
২০১৫ সালেও সময় লেগেছিল
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সর্বশেষ জাতীয় বেতন কাঠামো ঘোষণা করা হয়েছিল ২০১৫ সালে। সে সময় মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের প্রায় সাড়ে তিন মাস পর অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে বাস্তবায়নের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছিল।
এর আগে নতুন বেতন কাঠামোর বিভিন্ন দিক, আইনগত বিষয় ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া যাচাই-বাছাই করা হয়। এবারও একই ধরনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে নতুন পে স্কেল।
তবে এবার ৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারি হতে পারে বলে আভাস পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু ১৫ দিন পেরিয়ে গেলেও এখনো প্রজ্ঞাপন না হওয়ায় সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে অপেক্ষা বেড়েছে।
সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজার, সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫৬ হাজার
চলমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখেই নতুন পে স্কেল প্রণয়ন করা হয়েছে। এতে সর্বনিম্ন বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। নতুন বেতন কাঠামো ১ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।
তবে প্রজ্ঞাপনে কোন শ্রেণির কর্মচারীর ক্ষেত্রে কীভাবে এটি কার্যকর হবে, বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা কীভাবে সমন্বয় করা হবে—এসব বিষয় বিস্তারিতভাবে উল্লেখ থাকবে।
খসড়া প্রজ্ঞাপনে আইনি বিষয় যাচাই
দীর্ঘদিন প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করা সাবেক সচিব এ কে এস এম আব্দুল আউয়াল মজুমদারের মতে, প্রজ্ঞাপনের খসড়ায় ব্যবহৃত শব্দ, বাক্য ও আইনি পরিভাষাগুলো ভালোভাবে যাচাই করা জরুরি।
তার মতে, পে স্কেল বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংবিধিবদ্ধ আদেশও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কারণ এসব নথির সামান্য অস্পষ্টতাও পরবর্তী সময়ে বাস্তবায়নে জটিলতা তৈরি করতে পারে।
আব্দুল আউয়াল মজুমদার বলেন, কোনো সরকার এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়, যা তারা নিজেরা বাস্তবায়ন করতে পারবে না এবং পরবর্তী সরকারের জন্য রেখে যাবে। তিনি এটিকে অনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে পে কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সরকার চাইলে দুই বা তিন বছরে ধাপে ধাপে এটি বাস্তবায়ন করতে পারে। সে ক্ষেত্রে সরকারি কর্মচারীদেরও সেই সময় দেওয়া উচিত।
‘ওয়ান র্যাংক, ওয়ান পেনশন’ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি
এদিকে নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের জন্য ‘ওয়ান র্যাংক, ওয়ান পেনশন’ পদ্ধতি চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিএনপি সরকার।
তবে ২০১৯ সালের আগে অবসর নেওয়া বেসামরিক কর্মচারীদের প্রয়োজনীয় তথ্য না থাকায় এই ব্যবস্থা ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে পুরো ব্যবস্থাটি বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে।
সব মিলিয়ে নতুন পে স্কেলের অনুমোদন হয়ে গেলেও প্রজ্ঞাপন জারির আগে আরও কিছু প্রশাসনিক, আইনগত ও কারিগরি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হচ্ছে। এসব ধাপ শেষ হলেই বহুল প্রতীক্ষিত প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ার কথা।
প্রতিবেদকের নাম 




















