নথিবিহীন বা অনিয়মিত অবস্থায় থাকা অভিবাসীদের বহিষ্কার ও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আরও কঠোর করতে নতুন বিধিমালায় চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। এর ফলে সদস্য দেশগুলো অনিয়মিত অভিবাসীদের ফেরত পাঠানো, আটক এবং ইউরোপে পুনঃপ্রবেশে নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রে আরও বিস্তৃত ক্ষমতা পাবে।
গত ১ অক্টোবর লুক্সেমবার্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ইইউর কাউন্সিল নতুন ‘রিটার্ন রেগুলেশন’-এ আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেয়। এর আগে তিন মাস আগে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট বিধিমালাটি অনুমোদন করেছিল।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কোনো বিদেশিকে সংশ্লিষ্ট সদস্য রাষ্ট্র ত্যাগের নির্দেশ দিলে তাকে তা মেনে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সহযোগিতা করতে হবে। অন্যথায় আটক, বহিষ্কার বা ইউরোপে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার মতো ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
ইইউর বাইরে ‘রিটার্ন হাব’ স্থাপনের সুযোগ
নতুন বিধিমালায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের দেশগুলোতে ‘রিটার্ন হাব’ বা প্রত্যাবাসন কেন্দ্র স্থাপনের সুযোগ রাখা হয়েছে। এ ধরনের কেন্দ্রে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত পাওয়া ব্যক্তিদের পাঠানো যেতে পারে।
তবে যেসব দেশে তাদের পাঠানো হবে, সেসব দেশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চুক্তি বা সমঝোতা থাকতে হবে এবং দেশগুলোকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড ও জোরপূর্বক ফেরত না পাঠানোর নীতি মেনে চলতে হবে।
অভিভাবকহীন অপ্রাপ্তবয়স্কদের এই ব্যবস্থার আওতায় না রাখার কথা বলা হয়েছে। তবে শিশু-সন্তানসহ পরিবারকে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে প্রত্যাবাসন বা আটক ব্যবস্থার আওতায় আনা যেতে পারে।
২৪ মাস পর্যন্ত আটকের সুযোগ
নতুন বিধিমালায় প্রশাসনিক আটকের সর্বোচ্চ মেয়াদ ১৮ মাস থেকে বাড়িয়ে ২৪ মাস করার সুযোগ রাখা হয়েছে। পরিস্থিতির পরিবর্তন, নতুন তথ্য পাওয়া কিংবা সংশ্লিষ্ট তৃতীয় দেশের সঙ্গে সহযোগিতার উন্নতি হলে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে আরও ছয় মাস পর্যন্ত আটকের মেয়াদ বাড়ানো যেতে পারে।
কোনো ব্যক্তি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সহযোগিতা না করলে, পালিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে অথবা নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হলে তাকে আটক রাখার সুযোগ থাকবে।
এমনকি কোনো তৃতীয় দেশের নাগরিক ইইউর অন্য সদস্য রাষ্ট্রে চলে গেলে তার ক্ষেত্রে নতুন করে আটকের সময় গণনার সুযোগও রাখা হয়েছে।
ইউরোপে প্রবেশে দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞা
নতুন বিধিমালায় ইউরোপে পুনঃপ্রবেশের ওপর সাধারণভাবে সর্বোচ্চ ১০ বছরের নিষেধাজ্ঞার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে এই নিষেধাজ্ঞা সর্বোচ্চ ২০ বছর পর্যন্ত বাড়ানো যেতে পারে।
ইইউ কাউন্সিলের ভাষ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হলে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির প্রবেশ ঠেকানো প্রয়োজন ও আনুপাতিক বলে বিবেচিত হলে দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা সম্ভব হবে।
আপিল করলেও সবসময় বহিষ্কার স্থগিত হবে না
নতুন নিয়মে বহিষ্কারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বহিষ্কার স্থগিত থাকবে—এমন বিধান বাতিল করা হয়েছে। ফলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আপিল চলমান থাকলেও বহিষ্কার কার্যকর হতে পারে।
এ ছাড়া প্রয়োজন হলে কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির শরীর ও ব্যক্তিগত সামগ্রী তল্লাশি করতে পারবে। ব্যক্তিগত জিনিসপত্র এবং ইলেকট্রনিক ডিভাইস জব্দ করার ক্ষমতাও রাখা হয়েছে।
তবে এসব ব্যবস্থা প্রয়োগের সময় মৌলিক অধিকার, আইনি সুরক্ষা এবং কার্যকর প্রতিকারের সুযোগ নিশ্চিত করার কথা জানিয়েছে ইইউ।
সমর্থকদের দাবি, প্রত্যাবাসন কার্যকর হবে
ইইউর নতুন বিধিমালার সমর্থকদের মতে, নিজ দেশের সরকার যেসব অনিয়মিত অভিবাসীকে ফিরিয়ে নিতে অনিচ্ছুক, তাদের প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে নতুন ব্যবস্থা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
বর্তমানে ইইউতে দেশ ছাড়ার নির্দেশ পাওয়া বিদেশিদের ক্ষেত্রে জারি করা বহিষ্কার আদেশের মাত্র প্রায় ২০ শতাংশ বাস্তবে কার্যকর হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইইউর কাউন্সিলের সভাপতিত্বকারী দেশ আয়ারল্যান্ডের বিচার, স্বরাষ্ট্র ও অভিবাসনবিষয়ক মন্ত্রী জিম ও’ক্যালাহান বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়ার নির্দেশ পাওয়া প্রতি তিনজনের মধ্যে প্রায় দুজনই বাস্তবে ইইউ ত্যাগ করেন না।
মানবাধিকার নিয়ে উদ্বেগ
নতুন বিধিমালা নিয়ে মানবাধিকারকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগও রয়েছে। সমালোচকদের আশঙ্কা, ইইউর বাইরে ‘রিটার্ন হাব’ স্থাপনের সুযোগ অভিবাসীদের অধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রে নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বেলজিয়ামভিত্তিক বেসরকারি সংস্থা পিকাম (PICUM)-এর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নতুন নিয়মের ফলে অভিবাসীদের আটক ও বহিষ্কারের পরিধি বাড়তে পারে। একই সঙ্গে যেসব দেশের সঙ্গে তাদের ব্যক্তিগত বা সামাজিক কোনো সম্পর্ক নেই, সেসব দেশেও তাদের পাঠানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
সমালোচকদের আরও আশঙ্কা, আটক বা বহিষ্কারের ভয়ে অনিয়মিত অবস্থায় থাকা অনেক মানুষ সরকারি সেবা গ্রহণ কিংবা সুরক্ষার আবেদন থেকেও দূরে সরে যেতে পারেন।
নতুন বিধিমালার বেশিরভাগ বিধান কার্যকর হতে এক বছর সময় লাগবে। তবে ‘রিটার্ন হাব’সংক্রান্ত বিধানগুলো দ্রুত কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।
প্রতিবেদকের নাম 
























