নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে যেখানে প্রাণ হারিয়েছেন ১ হাজার ২৫২ জন, নিখোঁজ রয়েছেন হাজারো মানুষ, সেখানেই বেঁচে থাকার এক অসাধারণ নজির গড়েছেন ৯১ বছরের বৃদ্ধা গুণা মায়া বোহারা।
কাদা-পলিমাটিতে পুরো শরীর মাখামাখি। চারপাশে ধ্বংসস্তূপ। সেই অবস্থায় একটি জিসিবি এক্সকাভেটরের স্কুপে বসে উদ্ধার করা হচ্ছে তাঁকে—এই দৃশ্য এখন নেপালের ভয়াবহ বন্যার মধ্যে বেঁচে থাকার প্রতীক হয়ে উঠেছে।

কাদার নিচে থেকেও হার মানেননি
নুয়াকোটের নদীতীরবর্তী শহর দেবীঘাটের ‘সিনিয়র সিটিজেন্স ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন’ বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দা ছিলেন গুণা মায়া। গত সপ্তাহে পাহাড়ি ঢল, কাদা ও পাথরের স্রোত যখন জনপদের দিকে ধেয়ে আসে, তখন ওই বৃদ্ধাশ্রমের সাত বাসিন্দা ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান।
শারীরিক প্রতিবন্ধকতা এবং হাতে আঘাত থাকা সত্ত্বেও গুণা মায়া হাল ছাড়েননি। প্রবল পানির স্রোতের মধ্যে নিজের মাথা পানির ওপরে রাখার চেষ্টা করতে করতে প্রায় দুই থেকে তিন ঘণ্টা লড়াই করেন তিনি।
একপর্যায়ে ঘরের জানালা খুলে নিজেকে কাদার নিচে পুরোপুরি তলিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করেন ৯১ বছরের এই বৃদ্ধা।

কাদার ভেতর থেকে উদ্ধার
পরে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকেরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে কাদার মধ্যে শুধু তাঁর মাথাটি ভাসমান অবস্থায় দেখতে পান। এরপর এক্সকাভেটরের সাহায্যে জীবিত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করা হয়।
উদ্ধারের পর স্থানীয় একটি আয়ুর্বেদিক হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয় গুণা মায়াকে। পরে বেঁচে যাওয়া অন্যান্য প্রবীণদের সঙ্গে তাঁকেও হেলিকপ্টারে করে রাজধানী কাঠমান্ডুর একটি অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া হয়।
সেখানে তাঁদের জন্য খাবার, পোশাক, নার্সিং সেবা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। শারীরিক আঘাত থাকলেও গুণা মায়াসহ উদ্ধার হওয়া প্রবীণদের শারীরিক অবস্থা বর্তমানে স্থিতিশীল বলে জানা গেছে।

ধ্বংসস্তূপের মাঝেও চলছে উদ্ধার অভিযান
বৃদ্ধাশ্রম থেকে উদ্ধার হওয়া এক প্রবীণ ভয়াবহ সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করে জানান, সকালে নাস্তার সময় হঠাৎ ঘরের ছাদ কাঁপতে শুরু করে। এরপর উঁচু জায়গায় আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করলেও কাদার ভয়াবহ স্রোতে তাঁদের বেশ কয়েকজন সঙ্গী প্রাণ হারান।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নেপালে এই ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৫২ জনে। নিখোঁজ রয়েছেন অন্তত ৪ হাজার ২১৬ জন। তিব্বত সীমান্তের চীনা অংশে আরও ৫৪১ জন নিখোঁজ থাকায় মোট নিখোঁজের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৭৫৭ জনে।
এদিকে ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। নেপালি সেনাবাহিনী ও আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দল ভারী সরঞ্জাম ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গে আটকে পড়া শ্রমিকদের উদ্ধারে কাজ করে যাচ্ছে।
ভয়াবহ এই বিপর্যয়ের মধ্যে ৯১ বছরের গুণা মায়ার বেঁচে ফেরার ঘটনা তাই শুধু একটি উদ্ধারকাহিনি নয়; এটি চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও মানুষের বেঁচে থাকার অদম্য আকাঙ্ক্ষার এক অনন্য উদাহরণ।
প্রতিবেদকের নাম 



















