
ভারতের সংগীতজগতের অন্যতম পরিচিত শিল্পী জুবিন গার্গ। দীর্ঘ ৩৩ বছরের ক্যারিয়ারে ৪০টিরও বেশি ভাষায় প্রায় ৪০ হাজার গান গেয়েছেন তিনি। ২০০৬ সালে বলিউডের ‘গ্যাংস্টার’ সিনেমার ‘ইয়া আলি’ গান দিয়ে উপমহাদেশের শ্রোতাদের কাছে ব্যাপক পরিচিতি পান এই শিল্পী।
১৯ সেপ্টেম্বর জুবিন গার্গের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। গত বছরের এই দিনে ভক্তদের কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান তিনি।
আঞ্চলিক ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি বরাবরই ছিল তার গভীর টান। হিন্দি সিনেমায় জনপ্রিয়তা পেলেও বাংলা ও অসমিয়া ভাষার গান ও চলচ্চিত্রে তিনি নিজের সৃষ্টিশীলতার বড় একটি অংশ ব্যয় করেছেন।
১৯৯২ সালে অসমিয়া ভাষায় নিজের প্রথম অ্যালবাম ‘অনামিকা’ প্রকাশের মাধ্যমে তার সংগীতজীবনের যাত্রা শুরু। একই বছর ‘সপুরনোর সুর’ ও ‘অনুরাধা’ নামে আরও দুটি অ্যালবাম প্রকাশ করেন তিনি।
বলিউডে ‘ইয়া আলি’ থেকে ‘কৃষ থ্রি’
২০০০-এর দশকের শুরুতে বলিউডে কাজ শুরু করেন জুবিন। ২০০৬ সালে ‘গ্যাংস্টার’ সিনেমার ‘ইয়া আলি’ গান তাকে ব্যাপক জনপ্রিয়তা এনে দেয়। একই বছর ‘আই সি ইউ’ সিনেমার ‘সুবাহ সুবাহ’ গানেও কণ্ঠ দেন তিনি।
পরবর্তী সময়ে বলিউডে আরও বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় গান উপহার দেন জুবিন। তার বলিউড ক্যারিয়ারের শেষদিকের উল্লেখযোগ্য গান ‘দিল তু হি বাতা’, যা ‘কৃষ থ্রি’ সিনেমায় ব্যবহৃত হয়।
তবে এরপর বলিউডের চেয়ে আঞ্চলিক চলচ্চিত্র ও সংগীতেই বেশি মনোযোগী হন তিনি।
বাংলার গানেও ছিল জুবিনের উপস্থিতি
বাংলা চলচ্চিত্রেও জুবিন গার্গের কণ্ঠ শ্রোতাদের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠে। দেব, রাহুল, সোহমসহ টালিউডের বিভিন্ন অভিনেতার সিনেমায় তার কণ্ঠ শোনা গেছে।
‘বোঝেনা সে বোঝেনা’, ‘পিয়া রে’ ও ‘মন মানে না’র মতো গান বাংলা সংগীতপ্রেমীদের কাছেও তাকে পরিচিত করে তোলে।
কেন বলিউড থেকে দূরে সরে গিয়েছিলেন?
এক সাক্ষাৎকারে বলিউডে নতুন কাজ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে জুবিন জানিয়েছিলেন, তিনি তখন আসামে চলচ্চিত্র নির্মাণ, প্রযোজনা ও অভিনয় নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। একই সঙ্গে আঞ্চলিক বাজার—বিশেষ করে বাংলা ও অসমিয়া ভাষার কাজকে তিনি বেশি গুরুত্ব দিচ্ছিলেন বলেও জানান।
বলিউডের সংগীত নিয়ে নিজের অবস্থানও স্পষ্ট করেছিলেন জুবিন। তার বক্তব্য ছিল, বাংলা ও আসামের সংগীত ও চলচ্চিত্রে মৌলিক কাজের সুযোগ বেশি, আর বলিউডে নকলের প্রবণতা রয়েছে—যে কারণে তিনি সেখানে নিয়মিত কাজ করতে আগ্রহী ছিলেন না।
বাংলার প্রতি নিজের টান প্রসঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে জুবিন বলেছিলেন, কলকাতার পাশাপাশি পুরো বাংলার সংস্কৃতির প্রতিই তার ভালোবাসা রয়েছে। বাংলা ও আসামের সংস্কৃতি, খাবার ও জীবনযাত্রার মধ্যে মিলের কথাও উল্লেখ করেছিলেন তিনি। নিজেকে ‘আধা বাঙালি’ বলেও পরিচয় দিয়েছিলেন এই শিল্পী।
গায়ক ছাড়াও ছিলেন অভিনেতা ও নির্মাতা
জুবিন গার্গ শুধু গায়ক হিসেবেই পরিচিত ছিলেন না। অভিনয় ও চলচ্চিত্র নির্মাণেও নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন তিনি।
২০০০ সালের দিকে ‘তুমি মোর মাথো মোর’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে অভিনয় ও পরিচালনার কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে ‘দিনবন্ধু’, ‘মন যায়’, ‘মিশন চায়না’, ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’সহ বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রে কাজ করেন।
তার অভিনীত ও নির্মিত সর্বশেষ চলচ্চিত্র ‘রই রই বিনালে’ ২০২৫ সালে মুক্তি পায়, যা তার মৃত্যুর কয়েক মাস পর প্রেক্ষাগৃহে আসে।
মৃত্যুর এক বছর পরও আলোচনায় জুবিন
সিঙ্গাপুরে একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে যাওয়ার কথা ছিল জুবিনের। এর মধ্যেই গত বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর তার মৃত্যু হয়।
তার মৃত্যুর কারণ নিয়ে সিঙ্গাপুরের তদন্তে দুর্ঘটনাজনিত ডুবে মৃত্যুর কথা বলা হলেও, ভারতে এ ঘটনায় আলাদা তদন্ত হয়েছে। আসাম পুলিশের তদন্তে হত্যা ও অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের অভিযোগে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তার মৃত্যুকে ঘিরে তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া চললেও সংগীতজগতে জুবিন গার্গের অবদান নিয়ে কোনো বিরতি নেই। অসমিয়া, বাংলা ও হিন্দিসহ বিভিন্ন ভাষার গানে তার কণ্ঠ আজও শ্রোতাদের কাছে পরিচিত।
এক বছরের ব্যবধানে তার শারীরিক উপস্থিতি নেই, কিন্তু তার গাওয়া গান ও চলচ্চিত্রের কাজের মধ্য দিয়ে জুবিন গার্গ এখনও অসংখ্য শ্রোতার স্মৃতিতে জীবন্ত।
প্রতিবেদকের নাম 




















