বাবা-মায়ের জমিতে গড়ে ওঠা পাকা বাড়িতে সচ্ছল জীবনযাপন করছেন ছেলে। অথচ ৮০ বছর বয়সী মা মমেনা বেগমের দিন কাটছে মেয়ের বাড়ির জরাজীর্ণ ঘরে। জমি নিয়ে বিরোধের জেরে প্রায় ১৪ বছর আগে মা-বাবাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে কুড়িগ্রামের রাজারহাটের একটি ফাজিল মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোখলেছুর রহমানের বিরুদ্ধে। তবে মাকে একাধিকবার ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেও তিনি রাজি হননি বলে দাবি করেছেন ছেলে।
কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার উমরমজিদ ইউনিয়নের মমেনা বেগমের জীবন এখন কাটছে নানা কষ্টে। মেয়ের বাড়ির যে ঘরে তিনি থাকেন, তার টিনের চাল ও বেড়ায় অসংখ্য ফুটো। দিনের বেলায় সূর্যের আলো আর রাতে চাঁদের আলো ঘরে ঢোকে। বৃষ্টি হলে ভিজে যায় বিছানা-বালিশ। চোখে ঝাপসা দেখলেও কাঁথা সেলাই করে কোনোরকমে দিন পার করছেন তিনি।
মমেনার অভিযোগ, তাঁর স্বামী আব্দুস সাত্তারের সঙ্গে মিলে সন্তানদের জন্য জমি ভাগ করে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ার পর থেকেই ছেলের সঙ্গে বিরোধ শুরু হয়। মেয়েদের কিছু জমি দেওয়ায় সন্তুষ্ট ছিলেন না মোখলেছুর। আরও জমি লিখে দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁদের বাড়ি ছাড়তে বাধ্য করা হয়।
মোখলেছুর রহমান উপজেলার রাজমাল্লীরহাট সিদ্দিকীয়া ফাজিল মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ। বর্তমানে তিনি বাবা-মায়ের জমিতে নির্মিত বাড়িতে বসবাস করছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
জমি নিয়ে বিরোধ, মেয়ের বাড়িতে আশ্রয়
মমেনা বেগমের ভাষ্য, জমি লিখে না দিলে ছেলে তাঁকে বাড়িতে থাকতে দেবেন না বলে জানাতেন। তাঁর অভিযোগ, ছেলে তাঁকে ও তাঁর স্বামীকে মারধরের হুমকিও দিতেন।
মমেনা বলেন, ‘তোমরা তিন ভাইবোনে জমি খাইবেন। বোনদের কম দিবি, তুই বেশি খাবি।’
প্রায় ১৪ বছর আগে স্বামীসহ বাড়ি ছাড়ার পর মেয়ে খাদিজা বেগমের বাড়িতে আশ্রয় নেন তিনি। চার বছর আগে সেখানেই মারা যান তাঁর স্বামী আব্দুস সাত্তার। স্বামীকে নিজেদের বসতভিটায় দাফন করার ইচ্ছা থাকলেও তা পূরণ হয়নি বলে আক্ষেপ করেন মমেনা।
মমেনা ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বাবার মৃত্যুর খবর পেয়েও জানাজা ও দাফনে অংশ নেননি মোখলেছুর। নিজের কষ্টের কথা প্রকাশ করলে ছেলে তাঁকে মেরে ফেলতে পারেন বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বৃদ্ধা।
১৩ লাখ টাকা ফেরত চাওয়ার অভিযোগ
মমেনার মেয়ে খাদিজা বেগম বলেন, ছোট বোনের জন্য নির্ধারিত জমিতে তাঁদের মা ঘর নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মোখলেছুর রহমান এতে বাধা দেন। জমি লিখে দিতে অস্বীকৃতি জানালে বাড়ি নির্মাণে ব্যয় করা ১৩ লাখ টাকা ফেরত দিয়ে বাড়ি ছেড়ে যেতে হবে বলে দাবি করেন তিনি।
খাদিজার অভিযোগ, পারিবারিক বিরোধের কারণে তাঁদের বাবা-মাকে নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। একপর্যায়ে তাঁরা মেয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুর রশিদ বলেন, মোখলেছুরের মা-বাবা দীর্ঘদিন মেয়ের বাড়িতে ছিলেন। সেখানেই তাঁর বাবা মারা যান। এখন বৃদ্ধা মাও একই বাড়িতে কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। মা-বাবাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার পর মোখলেছুর তাঁদের খোঁজখবর রাখেননি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা সৈয়দ আলীর ভাষ্য, বাবার মৃত্যুর সময়ও মোখলেছুর জানাজা ও দাফনে উপস্থিত ছিলেন না। শিক্ষিত একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে মায়ের প্রতি এমন আচরণের অভিযোগ দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেন তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা ফারুক আহমেদ ঘটনাটির সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
যা বলছেন অভিযুক্ত ছেলে
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মোখলেছুর রহমান বলেন, ‘মাকে একাধিকবার ফিরতে বললেও তিনি আসেননি। অনেকবার আনার চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু আসেননি। তার জমিজমা তিনি মেয়েদের লিখে দিয়েছেন।’
অর্থাৎ, মাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগের বিপরীতে তিনি দাবি করেছেন, মাকে ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফিরে আসেননি। জমিজমা মেয়েদের নামে লিখে দেওয়ার বিষয়টিও বিরোধের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
চেয়ারম্যানের বক্তব্য ও আইনের প্রসঙ্গ
উমরমজিদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আহসানুল কবির আদিল বলেন, প্রতিটি সন্তানের দায়িত্ব ও কর্তব্য হলো বাবা-মায়ের সেবা করা। ১৪ বছর আগে মা-বাবাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ সত্য হলে তা অমানবিক কাজ। তবে এ বিষয়ে আগে কেউ তাঁর কাছে অভিযোগ করেননি বলে জানান তিনি। অভিযোগ পেলে বিষয়টি সুরাহার উদ্যোগ নিতেন বলেও উল্লেখ করেন চেয়ারম্যান।
কুড়িগ্রামের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আহসান হাবিব নিলু বলেন, বাবা-মায়ের নিরাপত্তা ও ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে সরকার ২০১৩ সালে পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন প্রণয়ন করেছে। এ আইনে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা ও শাস্তির বিধান রয়েছে।
জীবনের যে সময়ে সন্তানের কাছ থেকে আশ্রয়, যত্ন ও নিরাপত্তা পাওয়ার কথা, সেই বয়সে মমেনা বেগমকে দিন কাটাতে হচ্ছে জরাজীর্ণ ঘরে। অন্যদিকে, পারিবারিক জমিতে নির্মিত বাড়িতে ছেলের বসবাস ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। জীবনের শেষ সময়ে নিরাপত্তা, যত্ন ও সম্মান নিয়ে বাঁচতে চান এই বৃদ্ধা মা।
প্রতিবেদকের নাম 



















