বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) পূর্ণাঙ্গ ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ক্যানসার প্রতিরোধ, আধুনিক চিকিৎসা ও গবেষণার সক্ষমতা বাড়াতে একই সঙ্গে হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস (এইচপিভি) টিকাদান, জরায়ুমুখ ও স্তন ক্যানসারের স্ক্রিনিং এবং প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ কার্যক্রম জোরদারের সুপারিশ করেছেন তাঁরা।
রোববার (১৮ অক্টোবর) রাজধানীর বিএমইউর শহীদ ডা. মিল্টন হলে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব প্রস্তাব উঠে আসে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগের ২১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিভাগটি ও বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরাম (বিএইচআরএফ) যৌথভাবে এ বৈঠকের আয়োজন করে।
গবেষণা ও চিকিৎসাসেবায় সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব
‘অ্যাডভান্সিং ক্যান্সার এডুকেশন, রিসার্চ অ্যান্ড কেয়ার: বিএমইউ’স ভিশন অ্যান্ড লিডারশিপ’ শীর্ষক বৈঠকে প্রধান অতিথি ছিলেন বিএমইউর উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী। এতে চিকিৎসক, গবেষক, শিক্ষক, ওষুধশিল্পের প্রতিনিধি, চিকিৎসাপ্রযুক্তি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমকর্মীরা অংশ নেন।
বক্তারা বলেন, ক্যানসার চিকিৎসার উন্নয়নে শুধু আধুনিক যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো বাড়ালেই চলবে না। দক্ষ জনবল তৈরি, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল এবং বিভিন্ন বিশেষায়িত বিভাগের মধ্যে সমন্বয়ও প্রয়োজন।
বিএমইউতে পূর্ণাঙ্গ ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা গেলে উন্নত চিকিৎসা, উচ্চতর শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ বাড়বে। পাশাপাশি নতুন চিকিৎসাপদ্ধতি উদ্ভাবন এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতার ক্ষেত্রও বিস্তৃত হতে পারে।
উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী বলেন, ক্যানসার শিক্ষা, গবেষণা ও চিকিৎসাসেবায় বিএমইউর নেতৃত্ব আরও শক্তিশালী করতে হবে। এ জন্য উচ্চতর চিকিৎসা শিক্ষা, গবেষণা, দক্ষ জনবল তৈরি, ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো জরুরি।
তিনি বিএমইউকে ক্যানসার শিক্ষা, গবেষণা ও চিকিৎসাসেবার জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উৎকর্ষকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
এইচপিভি টিকা ও স্ক্রিনিং জোরদারের সুপারিশ
ক্যানসারের বোঝা কমাতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা ও প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা তামাক নিয়ন্ত্রণ, এইচপিভি টিকাদান, জরায়ুমুখ ও স্তন ক্যানসারের স্ক্রিনিং এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন।
বক্তারা বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যানসার শনাক্ত করা গেলে সময়মতো চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ বাড়ে। এ জন্য রোগের লক্ষণ সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করার পাশাপাশি সহজলভ্য স্ক্রিনিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। রোগ শনাক্তকরণ থেকে চিকিৎসা পর্যন্ত স্বাস্থ্যসেবার বিভিন্ন ধাপের মধ্যে কার্যকর সংযোগ নিশ্চিত করার কথাও বলেন তাঁরা।
ক্যানসারের তথ্যভান্ডার গড়ার আহ্বান
বাংলাদেশে ক্যানসারের প্রকৃত চিত্র জানতে জনসংখ্যাভিত্তিক ক্যানসার নিবন্ধনব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন বৈঠকে অংশ নেওয়া বিশেষজ্ঞরা।
তাঁদের মতে, এ ধরনের নিবন্ধনব্যবস্থা চালু হলে দেশে ক্যানসারে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা, রোগের ধরন এবং বিস্তারের প্রবণতা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যাবে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে জাতীয় পরিকল্পনা প্রণয়ন, গবেষণা এবং চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণ সহজ হবে।
আধুনিক চিকিৎসাপদ্ধতি ও দক্ষ জনবল প্রয়োজন
বিএমইউর ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা ও বর্তমান চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মো. আকরাম হোসেন বিভাগের অগ্রগতি, অর্জন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বৈজ্ঞানিক উপস্থাপনা দেন।
তিনি বলেন, ক্যানসার চিকিৎসায় ক্লিনিক্যাল অনকোলজি, মেডিক্যাল অনকোলজি, সার্জিক্যাল অনকোলজি, প্যাথলজি, রেডিওলজি, নিউক্লিয়ার মেডিসিন ও মেডিক্যাল ফিজিকসসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন। এতে রোগীর জন্য উপযুক্ত চিকিৎসাপদ্ধতি নির্ধারণ এবং চিকিৎসার মান উন্নত করা সম্ভব হবে।
উপস্থাপনায় মাল্টিডিসিপ্লিনারি টিউমার বোর্ডের কার্যক্রম, গবেষণাভিত্তিক চিকিৎসা এবং রেডিওথেরাপি, কেমোথেরাপি, ইমিউনোথেরাপি ও টার্গেটেড থেরাপির মতো আধুনিক চিকিৎসাপদ্ধতি নিয়ে আলোচনা হয়। পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক প্রকাশনা ও আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, আধুনিক চিকিৎসাপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি এসব যন্ত্র পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে দক্ষ জনবল তৈরি করতে হবে। এ জন্য ক্যানসার বিশেষজ্ঞ, মেডিক্যাল ফিজিসিস্ট, রেডিওথেরাপি টেকনোলজিস্ট, দক্ষ নার্সসহ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যকর্মীর প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি।
বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প খাতের যৌথ উদ্যোগ
ক্যানসার গবেষণা ও চিকিৎসাপ্রযুক্তির উন্নয়নে বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং শিল্প খাতের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান আলোচকেরা।
বৈঠকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও গবেষকেরা অংশ নেন। ওষুধশিল্প ও চিকিৎসাপ্রযুক্তি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।
আলোচনায় বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, মেডিক্যাল ফিজিকস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নতুন চিকিৎসাপ্রযুক্তি এবং ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে যৌথ উদ্যোগের সম্ভাবনা উঠে আসে। জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, বিএমইউ এবং অন্যান্য চিকিৎসা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যৌথ গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণে সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়।
ক্যানসার সচেতনতায় গণমাধ্যমের ভূমিকা
বৈঠকে বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি প্রতীক এজাজ ও সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদুল ইসলাম শুভসহ সংগঠনটির নেতারা এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন।
বক্তারা বলেন, ক্যানসার নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা দূর করা, প্রাথমিক লক্ষণ সম্পর্কে মানুষকে জানানো এবং চিকিৎসা নিতে দেরি করার প্রবণতা কমাতে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ জন্য ক্যানসার প্রতিরোধ, আধুনিক চিকিৎসা ও গবেষণার অগ্রগতি নিয়ে নির্ভরযোগ্য এবং বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য প্রচার করা প্রয়োজন।
২০০৫ সালের ১৯ অক্টোবর প্রতিষ্ঠিত বিএমইউর ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগ গত ২১ বছরে ক্যানসার চিকিৎসা, স্নাতকোত্তর শিক্ষা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তৈরি ও গবেষণায় ভূমিকা রেখেছে। বিভাগটিতে রেডিওথেরাপি, কেমোথেরাপি, ইমিউনোথেরাপি ও টার্গেটেড থেরাপিসহ বিভিন্ন আধুনিক চিকিৎসাসেবা দেওয়ার পাশাপাশি গবেষণা ও আন্তর্জাতিক একাডেমিক সহযোগিতার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, বিএমইউতে পূর্ণাঙ্গ ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা গেলে শিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং সমন্বিত চিকিৎসাসেবার পরিসর আরও বাড়বে। একই সঙ্গে ক্যানসার প্রতিরোধ, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সরকার, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, ওষুধশিল্প ও গণমাধ্যমকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তাঁরা।
প্রতিবেদকের নাম 






















