শাহাবুদ্দিন শুভ
প্রধান সম্পাদক, সিলেটপিডিয়া
‘মারবা ঠিক আছে, শুধু দুই বাচ্চারে ঘুম পাড়িয়ে আসি’—একজন মায়ের এই আকুতি শুধু একটি পরিবারের কান্না নয়; এটি আমাদের সমাজের বিবেকের সামনে রাখা এক কঠিন প্রশ্ন।
একজন মা নিজের ওপর চলা নির্যাতনের মধ্যেও নিজের কথা ভাবেননি। তাঁর চিন্তা ছিল দুই সন্তানকে নিয়ে। সন্তানদের কান্না থামিয়ে, তাদের ঘুম পাড়িয়ে আসার জন্য তিনি সামান্য সময় চেয়েছিলেন। কিন্তু সেই সময়টুকুও তিনি পাননি।
এরপর যা ঘটেছে, তা কেবল একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়। এটি আমাদের সমাজের দীর্ঘদিনের নীরবতা, সহিংসতার প্রতি উদাসীনতা এবং ‘স্বামী-স্ত্রীর ব্যাপার’ বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সংস্কৃতির নির্মম পরিণতি।
সাম্প্রতিক সময়ে ভারত ও বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া দুটি ঘটনা আবারও সেই প্রশ্ন সামনে এনেছে।
দুই ঘটনা, একই প্রশ্ন
মহারাষ্ট্রের নাগপুরে ৩৮ বছর বয়সী গৃহবধূ যামিনী কৃষ্ণ লাল যাদবের মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর স্বামী কৃষ্ণ লাল যাদবকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নাচের ক্লাসে যাওয়া এবং রান্না করা নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরোধের পর তাঁকে মারধর করা হয়। পরে হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। ময়নাতদন্তে শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
অন্যদিকে ঢাকার খিলক্ষেতে ২৫ বছর বয়সী মুক্তা ইসলামের মৃত্যুর ঘটনাও আমাদের গভীরভাবে নাড়া দেয়। পরিবারের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে তিনি স্বামীর নির্যাতনের শিকার ছিলেন।
মৃত্যুর আগে তাঁকে নির্যাতনের একটি ভিডিওও পরিবারের কাছে পাঠানো হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁর মৃত্যু হত্যা না আত্মহত্যা—তা তদন্তের বিষয়। তবে নির্যাতনের অভিযোগটি ইতোমধ্যে একটি ভয়াবহ বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করছে।
দুটি ঘটনা দুই দেশের। কিন্তু প্রশ্নটি এক—একজন নারীকে নির্যাতন করার অধিকার একজন পুরুষকে কে দিয়েছে?
স্ত্রী কি স্বামীর সম্পত্তি?
আমাদের সমাজের একটি বড় সমস্যা হলো, এখনো অনেক পুরুষ মনে করেন—স্ত্রীকে নিয়ন্ত্রণ করা তাঁর অধিকার। স্ত্রী কখন কোথায় যাবেন, কার সঙ্গে কথা বলবেন, কী পরবেন, কখন রান্না করবেন—সবকিছুতেই স্বামীর নির্দেশ মানতে হবে।
এই মানসিকতার সঙ্গে যখন যুক্ত হয় সন্দেহ, যৌতুক, মাদক, আর্থিক সংকট, দাম্পত্য কলহ কিংবা বিকৃত পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা, তখন একটি পরিবার হয়ে উঠতে পারে নারীর জন্য সবচেয়ে অনিরাপদ জায়গা।
অথচ বিবাহ কোনো মালিকানা প্রতিষ্ঠার চুক্তি নয়।
স্ত্রী স্বামীর সম্পত্তি নন। স্বামীও স্ত্রীর মালিক নন।
বিয়ে হচ্ছে পারস্পরিক সম্মান, দায়িত্ব, ভালোবাসা ও নিরাপত্তার সম্পর্ক। রান্না নিয়ে মতবিরোধ হতে পারে। নাচের ক্লাসে যাওয়া নিয়ে মতের অমিল হতে পারে। সংসারে ঝগড়া হতে পারে। কিন্তু কোনো মতবিরোধই কাউকে অন্যজনের ওপর সহিংসতা চালানোর অধিকার দেয় না।
সহিংসতা হঠাৎ শুরু হয় না
নারী হত্যার খবর প্রকাশের পর আমরা প্রায়ই বিস্মিত হই—‘এমন হলো কীভাবে?’ কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক ক্ষেত্রেই সহিংসতা হঠাৎ করে শুরু হয় না।
তার আগে থাকে অপমান, গালাগাল, সন্দেহ, ভয় দেখানো, অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, যৌতুকের চাপ, সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া কিংবা ছোটখাটো শারীরিক নির্যাতন।
একটি চড়কে যখন পরিবার ‘স্বাভাবিক’ বলে মেনে নেয়, তখন অপরাধী আরও বড় সহিংসতার সাহস পায়।
একজন নারী যখন বলেন, ‘আমাকে মারধর করা হয়েছে’, তখন যদি পরিবার বলে—‘সংসার করো, এসব হতেই পারে’, তখন আমরা অজান্তেই নির্যাতনকারীকে উৎসাহ দিই।
আর যখন প্রতিবেশী নির্যাতনের শব্দ শুনেও বলেন—‘স্বামী-স্ত্রীর ব্যাপার’, তখন নীরবতাও এক ধরনের সামাজিক ব্যর্থতা।
মৃত্যুর পর বিচার নয়, আগে নিরাপত্তা
অপরাধীর বিচার অবশ্যই হতে হবে। হত্যার অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর শাস্তিও নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু শুধু মৃত্যুর পর বিচার দিয়ে নারী নির্যাতন বন্ধ করা যাবে না।
আমাদের ভাবতে হবে—একজন নারীকে মৃত্যুর আগেই কীভাবে রক্ষা করা যায়?
কোনো নারী নির্যাতনের অভিযোগ করলে দ্রুত তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজন হলে তাঁকে নিরাপদ আশ্রয়, আইনি সহায়তা, চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা দিতে হবে।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে বুঝতে হবে, পারিবারিক সহিংসতার অভিযোগ ‘ছোটখাটো পারিবারিক ঝামেলা’ নয়। এটি ভবিষ্যৎ বড় অপরাধের সতর্কসংকেতও হতে পারে।
শিশুদের কথাও আমাদের ভাবতে হবে
নারী নির্যাতনের সবচেয়ে অবহেলিত শিকার অনেক সময় শিশুরা।
একজন মা যখন নির্যাতিত হন, সন্তান শুধু মাকে হারানোর ঝুঁকিতে পড়ে না; তার নিরাপত্তাবোধও ভেঙে পড়ে। ‘মাকে বাবা মেরেছে’—এই দৃশ্য কিংবা এই ধারণা নিয়ে বেড়ে ওঠা একটি শিশুর মানসিক জগতে কী ধরনের ক্ষত তৈরি হয়, তা আমরা কতটা ভাবি?
আজ যে শিশু মায়ের কান্না দেখছে, সে আগামী দিনের সমাজের সদস্য। সে কী শিখছে?
সে কি শিখছে যে শক্তিশালী ব্যক্তি দুর্বলকে মারতে পারে? নাকি সে শিখবে—মানুষের প্রতি সম্মান, সহমর্মিতা ও দায়িত্বই সভ্যতার পরিচয়?
এই প্রশ্নের উত্তর আমাদেরই দিতে হবে।
আইন আছে, এখন দরকার কার্যকর প্রয়োগ
বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে আইন রয়েছে। জরুরি সহায়তার জন্য জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ রয়েছে। কিন্তু আইন থাকার পাশাপাশি প্রয়োজন দ্রুত ও কার্যকর প্রয়োগ।
একজন নারী যখন প্রথমবার নির্যাতনের শিকার হন, তখনই যদি ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তাহলে হয়তো পরবর্তী বড় বিপর্যয় ঠেকানো সম্ভব। তাই প্রতিটি অভিযোগকে গুরুত্ব দিতে হবে।
প্রয়োজনে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোতে সামাজিক ও প্রশাসনিক নজরদারি বাড়াতে হবে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, পুলিশ, নারী অধিকার সংগঠন, আইনজীবী এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
একই সঙ্গে পুরুষদের মধ্যেও সচেতনতা বাড়াতে হবে। নারীকে সম্মান করা কোনো দয়া নয়; এটি একজন মানুষের মৌলিক অধিকারকে স্বীকার করা।
‘সংসার টিকিয়ে রাখো’—এই পরামর্শ সবসময় সমাধান নয়
আমাদের সমাজে মেয়েদের প্রায়ই বলা হয়—‘সংসারটা টিকিয়ে রাখো।’
কিন্তু প্রশ্ন হলো, কোন সংসার?
যে সংসারে ভালোবাসা আছে, সম্মান আছে, নিরাপত্তা আছে—সেই সংসার অবশ্যই টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করা উচিত।
কিন্তু যে সংসারে প্রতিনিয়ত নির্যাতন, ভয়, অপমান ও সহিংসতা চলছে, সেখানে শুধু সামাজিক মর্যাদার কথা বলে একজন নারীকে আটকে রাখা কোনো সমাধান নয়।
বরং তাঁকে নিরাপদ থাকার পথ দেখানোই মানবিক দায়িত্ব।
আমাদের নীরবতারও বিচার হওয়া দরকার
একজন নির্যাতনকারীকে আমরা দ্রুত অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করি। কিন্তু তার আগে যারা নির্যাতনের খবর জেনেও চুপ ছিলেন, তাদের ভূমিকা নিয়েও সমাজকে ভাবতে হবে।
অবশ্যই প্রত্যেক ঘটনার আইনি দায় ব্যক্তির। কিন্তু সামাজিক দায়ও অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
একজন মা যখন সাহায্য চান, তখন তাঁর পাশে দাঁড়াতে হবে। একজন বোন যখন বলেন, ‘আমাকে মারধর করা হচ্ছে’, তখন তাঁকে চুপ করিয়ে দেওয়া যাবে না।
একজন প্রতিবেশী যখন নির্যাতনের আওয়াজ শুনবেন, তখন ‘পারিবারিক ব্যাপার’ বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়া উচিত নয়।
কারণ একটি জীবন হারানোর পর অনুশোচনা কোনো জীবন ফিরিয়ে দিতে পারে না।
আর কোনো মায়ের এমন আকুতি শুনতে চাই না
‘মারবা ঠিক আছে, শুধু দুই বাচ্চারে ঘুম পাড়িয়ে আসি’—এই একটি বাক্যই যেন আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করে।
একজন মা মৃত্যুভয়ের মধ্যেও সন্তানদের কথা ভাবছেন, আর আমরা কি সেই মায়ের নিরাপত্তার কথা ভাবছি?
নাগপুরের যামিনী কিংবা ঢাকার মুক্তা—তাঁদের জীবনের পরিণতি আমাদের জন্য সতর্কবার্তা। এই ঘটনাগুলোকে শুধু সংবাদ হিসেবে দেখলে চলবে না। প্রতিটি ঘটনা থেকে শিক্ষা নিতে হবে।
এগুলো অন্যায়। এগুলো অপরাধ। আর অপরাধের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদটি হতে হবে পরিবার থেকে, দ্বিতীয়টি সমাজ থেকে এবং তৃতীয়টি রাষ্ট্রের আইন ও বিচারব্যবস্থা থেকে।
আমরা এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে কোনো নারী নির্যাতিত হয়ে বলবেন না—‘আমাকে মারো, কিন্তু আগে আমার সন্তানদের দেখে আসতে দাও।’
বরং তিনি বলতে পারবেন—
‘আমি নিরাপদ। আমার সন্তানও নিরাপদ। অন্যায় হলে আমার পাশে দাঁড়ানোর মানুষ আছে।’
সেই সমাজ গড়ে তোলার দায়িত্ব শুধু রাষ্ট্রের নয়। দায়িত্ব আমাদের সবার।
প্রতিবেদকের নাম 

























