মিশিগান থেকে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সিনেটর পদে মনোনয়ন জিতে মার্কিন রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছেন মিশরীয় বংশোদ্ভূত আবদুল এল সাইদ। আগামী নভেম্বরের মিডটার্ম নির্বাচনে জয়ী হলে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর হওয়ার গৌরব অর্জন করবেন ৪১ বছর বয়সী এই রাজনীতিবিদ।
ইসরায়েলে মার্কিন সামরিক সহায়তার বিরোধিতা, ট্রাম্প প্রশাসনের সমালোচনা এবং সবার জন্য সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবার দাবিকে সামনে রেখে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করেছেন এল সাইদ।
মিশর থেকে ডেট্রয়েট, তারপর রাজনীতির মূলধারায়
আগস্টের শুরুতে মিশিগানের ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সিনেট মনোনয়ন নিশ্চিত করার পর বিজয়ী ভাষণে নিজের পারিবারিক শেকড়ের কথা তুলে ধরেন এল সাইদ। তার বাবা মিশর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী হয়ে ডেট্রয়েটে বসতি গড়েছিলেন।
এল সাইদের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিবারের অন্যদের মতো তারও মিশরে ট্যাক্সি চালানোর জীবন হতে পারত। কিন্তু বাবার যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনের কারণে তিনি আমেরিকান পরিচয় পান এবং পরবর্তীতে দেশটির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে পৌঁছান।
ইসরায়েল ইস্যুতে স্পষ্ট অবস্থান
এল সাইদের নির্বাচনী প্রচারণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল বিদেশি সামরিক খাতে মার্কিন অর্থায়নের বিরোধিতা। ইসরায়েল, মিশর, সৌদি আরব কিংবা পাকিস্তান—কোনো দেশের সেনাবাহিনীতে মার্কিন করদাতাদের অর্থ ব্যয় না করে সেই অর্থ দেশের অবকাঠামো, শিক্ষা ও জনকল্যাণে ব্যবহারের পক্ষে তিনি।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীকে মার্কিন অর্থ সহায়তারও কঠোর সমালোচনা করেছেন তিনি। তার এই অবস্থান তাকে ডেমোক্র্যাটিক দলের প্রগতিশীল ভোটারদের একটি বড় অংশের কাছে জনপ্রিয় করে তোলে।
ট্রাম্পের সমালোচনা, এল সাইদের পাল্টা বক্তব্য
ইসরায়েল ইস্যুতে এল সাইদের অবস্থানের কারণে সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়েছে তাকে। ট্রাম্প তাকে ইহুদিবিদ্বেষী হিসেবে আখ্যা দিয়ে তার বিরুদ্ধে মন্তব্য করেন।
এর জবাবে এল সাইদ বলেছেন, মিশিগানের ইহুদি সম্প্রদায়সহ সব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চান তিনি। নিজের পরিবারের সদস্যদের জন্য যে নিরাপত্তা প্রত্যাশা করেন, অন্য নাগরিকদের জন্যও একই নিরাপত্তা চান বলে জানিয়েছেন তিনি।
প্রতিদ্বন্দ্বী মাইক রজার্স
নভেম্বরের মিডটার্ম নির্বাচনে মিশিগানের সিনেটর পদে এল সাইদের প্রতিদ্বন্দ্বী হবেন রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্স। তিনি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত।
এল সাইদের প্রচারণায় করপোরেট অর্থের প্রভাব কমানো, সাধারণ মানুষের আয় ও জীবনযাত্রার উন্নতি এবং সবার জন্য সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
ডেমোক্র্যাট নেতৃত্বের বাইরে থেকেও জয়
দলীয় কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বড় ধরনের সমর্থন ছাড়াই ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মনোনয়ন জয় করেছেন এল সাইদ। এ কারণে তাকে দলের একজন ‘বহিরাগত’ হিসেবেও বিবেচনা করা হচ্ছে।
তবে ডেমোক্র্যাটদের প্রগতিশীল ধারার গুরুত্বপূর্ণ নেতা বার্নি স্যান্ডার্স ও আলেক্সান্দ্রা ওকাসিও-কর্টেজের মতো নেতারা তার প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।
তার মনোনয়ন জয়ের পেছনে ইসরায়েল ইস্যুতে স্পষ্ট অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তার প্রতিদ্বন্দ্বী হেইলি স্টিভেন্সের নির্বাচনী তহবিলের বড় অংশ ইসরায়েলপন্থী প্রতিষ্ঠান আইপ্যাক থেকে এসেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০১৮ সালেই রাজনীতিতে বড় পদক্ষেপ
মূলধারার রাজনীতিতে এল সাইদের সক্রিয় পদচারণা শুরু হয় ২০১৮ সালে মিশিগানের গভর্নর নির্বাচনের মাধ্যমে। ওই নির্বাচনে তিনি পরাজিত হলেও মোট ভোটের ৩০ শতাংশের বেশি পেয়েছিলেন।
তবে রাজনীতির প্রতি তার আগ্রহের শুরু আরও আগে। ২০০৭ সালে মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে শ্রেষ্ঠ শিক্ষার্থী হিসেবে বক্তব্য দেন তিনি। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন তার বক্তব্যের প্রশংসা করেন। ঘটনাটি তার রাজনৈতিক জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে।
জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা হিসেবেও সফল
রাজনীতিতে আসার আগে জনস্বাস্থ্য খাতে কাজ করেছেন এল সাইদ। মাত্র ৩০ বছর বয়সে ২০১৫ সালে তিনি ডেট্রয়েট শহরের জনস্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক হন। যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বড় শহরে এত কম বয়সে এই পদে দায়িত্ব নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে তিনি অন্যতম।
দায়িত্ব পালনকালে শিশু মৃত্যুহার কমানো, শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে চশমা বিতরণ এবং শতাধিক স্কুলে সীসার মাত্রা পরীক্ষা করার মতো বিভিন্ন উদ্যোগ নেন তিনি।
সিনেট নির্বাচনে জয় পেলে কী হতে পারে?
নভেম্বরের নির্বাচনে এল সাইদের জয় শুধু মিশিগান নয়, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের পক্ষে ভোট দেওয়া মিশিগান যদি সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের দখলে যায়, তাহলে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের কৌশল নির্ধারণেও তা প্রভাব ফেলতে পারে।
একই সঙ্গে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব ও মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় মধ্যপন্থী রাজনীতির পরিবর্তে প্রগতিশীল বা বামঘেঁষা ধারার প্রার্থীদের গুরুত্ব বাড়ার সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।
প্রতিবেদকের নাম 





















