বিশ্ব স্থাপত্যের অন্যতম অনন্য নিদর্শন জাতীয় সংসদ ভবন রক্ষণাবেক্ষণের অভাব ও দীর্ঘদিনের সংস্কার জটিলতায় ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। বৃষ্টি হলেই ভবনের বিভিন্ন স্থানে ছাদ চুইয়ে পানি পড়ছে। কোথাও কোথাও জমছে পানি। বিশেষ করে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার নিচে থাকা কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, বৈদ্যুতিক সাবস্টেশন, জেনারেটরসহ গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে সংসদ ভবনের অবকাঠামোগত সমস্যা সমাধান, সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর সম্ভাব্যতা যাচাই এবং সংসদীয় কার্যক্রমকে প্রযুক্তিনির্ভর করতে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে সংসদ ভবন ও এর প্রাঙ্গণের পরিচ্ছন্নতা, সবুজায়ন এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারকাজ দ্রুত সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পাশাপাশি সৌর প্যানেল স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সুপারিশ এবং ই-পার্লামেন্ট প্রকল্প বাস্তবায়নে ১০ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রায় ৪৫ বছরের পুরনো সংসদ ভবনের মূল স্থাপনা ছাড়াও দক্ষিণ প্লাজা, ভিআইপি বাংলো, মিনিস্টার্স হোস্টেল, পুরনো সংসদ সদস্য হোস্টেল ও সচিব হোস্টেলের বিভিন্ন ভবনে পানি পড়ার সমস্যা রয়েছে। প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বৃষ্টির পানি প্রবেশ করে এসব স্থাপনার বিভিন্ন অংশে। সামান্য বৃষ্টিতেও কোথাও কোথাও জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার নিচে অবস্থিত মেইন মেকানিক্যাল প্লান্টে (এমএমপি)। সেখানে কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, জিআইএস প্যানেল, জেনারেটর, বৈদ্যুতিক সাবস্টেশন ও কেন্দ্রীয় স্টোররুমের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রয়েছে। দক্ষিণ প্লাজার ছাদ থেকে পানি পড়ে এমএমপি কক্ষ জলমগ্ন হওয়ার ঘটনা ঘটছে। এতে বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতিতে শর্টসার্কিট, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বিকল হওয়াসহ বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এ ছাড়া সংসদ ভবনের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ মানিক মিয়া এভিনিউয়ের বকুলতলা গেট সামান্য বৃষ্টিতেই ডুবে যায়। ফলে বৃষ্টির সময় চলাচল ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় ভোগান্তি বাড়ে।
সংসদের গত অধিবেশনে বিষয়টি তুলে ধরে সরকারদলীয় সংসদ সদস্য ও হুইপ জি কে গউছ জানান, সংসদের মসজিদের সামনে ছাদ থেকে পানি পড়ায় সারি সারি বালতি রাখতে হচ্ছে। এ বিষয়ে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালও দুঃখ প্রকাশ করেন। পরে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি এক সপ্তাহের মধ্যে সমস্যার সমাধানের আশ্বাস দিলেও নির্ধারিত সময়ে তা সম্পন্ন হয়নি।
এমএমপির দায়িত্বে থাকা গণপূর্ত বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আসাদুজ্জামান জানান, বৃষ্টির পানি থেকে যন্ত্রপাতি রক্ষায় দক্ষিণ প্লাজার ছাদের নিচে টিনের ছাউনি দেওয়া হয়েছে। তবে এটি সাময়িক ব্যবস্থা, স্থায়ী সমাধান নয়।
সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা যায়, গত ১৫ অক্টোবর সংসদ ভবন প্রাঙ্গণ পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় তিনি মাঠ, বাগান ও ভবনের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখেন এবং পরিচ্ছন্নতা, সবুজায়ন ও প্রয়োজনীয় সংস্কারকাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন। সংসদ ভবনের স্বতন্ত্র স্থাপত্যশৈলী ও নান্দনিক পরিবেশ অক্ষুণ্ন রাখতে নিয়মিত তদারকির ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
শেরেবাংলানগর গণপূর্ত বিভাগ-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী নাহিদ পারভেজ জানান, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-আন্দোলনের সময় সংসদ ভবন এলাকায় ভাঙচুর ও লুটপাটে ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোর সংস্কারকাজ চলছে। ভবনের বিভিন্ন স্থানে পানি পড়া ঠেকাতে গ্লাস ব্রিকসের সংযোগস্থল মেরামত এবং বিভিন্ন ভবনের ছাদ পানি প্রতিরোধী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে বাজেটের সীমাবদ্ধতায় সব কাজ একসঙ্গে শেষ করা কঠিন। এ কারণে সংসদ ভবনের সামগ্রিক সমস্যা সমাধানে সমন্বিত প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সৌরবিদ্যুতের সম্ভাব্যতা যাচাই
সংসদ ভবনে বিদ্যুতের ব্যবহার ও সিস্টেম লস কমানোর পাশাপাশি বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে সৌর প্যানেল স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সুপারিশ করেছে সংশ্লিষ্ট কমিটি। গত ১৫ অক্টোবর ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় সংসদ ভবন ও সংসদ এলাকায় মোট বিদ্যুতের চাহিদা নিরূপণ এবং সৌর প্যানেল স্থাপনের উপযোগী স্থান চিহ্নিত করার বিষয়ে আলোচনা হয়।
সম্ভাব্য স্থানগুলোর মানচিত্র তৈরি এবং প্রস্তাবিত স্থানে সৌর প্যানেল স্থাপনের পরিকল্পনার ত্রিমাত্রিক অ্যানিমেশন প্রস্তুত করে পরবর্তী সভায় উপস্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) অথবা অন্য কোনো স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সুপারিশ করা হয়। এ জন্য তিন সদস্যের একটি উপকমিটিও গঠন করা হয়েছে।
তবে সৌর প্যানেল স্থাপনের ক্ষেত্রে সংসদ ভবনের মূল স্থাপত্যশৈলী ও স্থপতি লুই আই কানের নকশা অক্ষুণ্ন রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্যের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব যাচাই এবং অধিবেশন ছাড়া অন্য সময়ে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বন্ধ রাখার প্রভাব নিয়ে ১৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
ই-পার্লামেন্ট প্রকল্পে ১০ সদস্যের কমিটি
সংসদীয় কার্যক্রমকে আরও আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) প্রণীত ‘ই-জাতীয় সংসদ প্রকল্প’ বাস্তবায়নে ১০ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সভাপতি করা হয়েছে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালকে। সদস্য হিসেবে রয়েছেন সংসদ সদস্য এ বি এম আশরাফ উদ্দিন (নিজান), নায়াব ইউসুফ আহমেদ, মীর আহমাদ বিন কাসেম, সাঈদ আল নোমান, হুম্মাম কাদের চৌধুরী, মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান, আখতার হোসেন, লুত্ফুল্লাহেল মাজেদ ও আন্না মিনজ। মহাপরিচালক (বিঅ্যান্ডআইটি) কমিটির সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
কমিটি ইউএনডিপির প্রণীত প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব পর্যালোচনা করে সুপারিশ দেবে এবং বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করবে।
সংসদ সদস্য আন্না মিনজ বলেন, দেশের গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা ও নিরাপত্তা অক্ষুণ্ন রাখতে সংসদ ভবনের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধান জরুরি। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ইতোমধ্যে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা নির্ভর করবে যথাযথ পরিকল্পনা, প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ, সময়মতো বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করার ওপর।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, সংসদ ভবনের অবকাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাময়িক মেরামতের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত সংস্কার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন জরুরি। পর্যাপ্ত বাজেট, কার্যকর তদারকি এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে ভবনের ঐতিহ্য, স্থাপত্যশৈলী ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হবে।
প্রতিবেদকের নাম 





















