পটুয়াখালী পৌর শহরের কলাতলা এলাকার তরুণ মেহেরাব ইমনের শুরুটা ছিল নিছক শখ থেকে। কিন্তু সেই শখই এখন পরিণত হয়েছে লাভজনক ব্যবসায়। বাড়ির আঙিনায় রঙিন মাছ চাষ করে বর্তমানে মাসে লাখ টাকারও বেশি আয় করছেন তিনি।
ইমনের খামারে সারি সারি বোতল ও জারে ঘুরে বেড়াচ্ছে নানা রঙের বেটা, মলি, গাপ্পি, সোর্ডটেল, গোল্ডফিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। লাল, নীল, হলুদসহ নানা রঙের মাছের সমারোহে ছোট্ট খামারটি যেন রঙিন এক জগৎ।
২০২১ সালে পড়াশোনা শেষ করার পর শখের বশে বেটা মাছ চাষ শুরু করেন ইমন। ঢাকায় বোনের বাসায় বিভিন্ন রঙের বেটা মাছ দেখে তার আগ্রহ তৈরি হয়। পরে বন্ধুদের কাছ থেকে ধার করে পাঁচ জোড়া মাছ কিনে শুরু করেন চাষ।
তবে শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না। পরিচর্যার অভিজ্ঞতা না থাকায় প্রথম দফাতেই প্রায় সব মাছ মারা যায়। এতে হতাশ হলেও হাল ছাড়েননি ইমন। ইন্টারনেট থেকে মাছের পরিচর্যা, পানির মান, খাবার, তাপমাত্রা ও প্রজনন সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করেন। পাশাপাশি নিজেই নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে থাকেন।
ইমন বলেন, শুরুতে মাছ চাষ সম্পর্কে তেমন কোনো ধারণা ছিল না। প্রথম দিকে অনেক মাছ মারা যাওয়ার পর বুঝতে পারেন, শুধু মাছ কিনে রাখলেই হবে না; প্রতিটি বিষয়ে সঠিক জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। অনলাইন থেকে শেখা এবং নিজের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ধীরে ধীরে মাছ মারা যাওয়ার হার কমিয়ে উৎপাদন বাড়াতে সক্ষম হন তিনি।
পরের বছর পটুয়াখালী শহরের বটতলা মসজিদ এলাকায় পৈতৃক জমিতে বাণিজ্যিকভাবে খামার গড়ে তোলেন ইমন। বর্তমানে তার খামারে রয়েছে হাজারো রঙিন মাছ। ফাইটার, মুন টেইল মলি, রোজ টেইল, ফেদার টেইল, গোল্ডফিশ ও হাফ মুনসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষ করছেন তিনি।
চার মাসেই বিক্রির উপযোগী
ইমন জানান, ডিম থেকে মাছ বড় হয়ে বিক্রির উপযোগী হতে প্রায় চার মাস সময় লাগে। প্রজাতি ও মান অনুযায়ী এক জোড়া মাছ ৫০০ থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি করেন তিনি। আর পাইকারি বাজারে ১০০টি মাছ বিক্রি হয় প্রায় ১২ থেকে ১৩ হাজার টাকায়।
মাছের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি উন্নতমানের বিভিন্ন জাত তৈরিতেও গুরুত্ব দিচ্ছেন এই উদ্যোক্তা। খামারে মাছের খাবারের পেছনে মাসে প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা খরচ হয়। এর একটি বড় অংশের খাবার তিনি নিজেই উৎপাদন করেন, ফলে খরচও কিছুটা কমে।
ইমন বলেন, রঙিন মাছ চাষে নিয়মিত পরিচর্যা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পানির মান ঠিক রাখা, সময়মতো খাবার দেওয়া এবং প্রজননের সময় আলাদা ব্যবস্থা করার মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হয়।
অনলাইনে দেশজুড়ে বিক্রি
ইমনের খামারের মাছ এখন আর শুধু পটুয়াখালীতেই সীমাবদ্ধ নেই। অনলাইনের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জেলার ক্রেতাদের কাছে মাছ বিক্রি করছেন তিনি। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা, বাগেরহাট, বগুড়া ও রাজশাহীসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে নিয়মিত অর্ডার আসে।
কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থানে জীবন্ত মাছ পাঠানো হয়। ইমন জানান, অনলাইনের কারণে পটুয়াখালীতে বসেই দেশের বড় বাজারে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে। তবে জীবন্ত মাছ পরিবহনের ক্ষেত্রে প্যাকেজিং ও পরিবহনে বাড়তি সতর্কতা নিতে হয়।
ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়ছে
তার খামারে বিভিন্ন বয়সী মানুষ মাছ কিনতে আসেন। শিশু-কিশোরদের মধ্যে রঙিন মাছের প্রতি আগ্রহ বিশেষভাবে বেশি।
স্থানীয় ক্রেতা আসাদুজ্জামান মিলন জানান, আগে রঙিন মাছ কিনতে পটুয়াখালীর বাইরে থেকে আনতে হতো। এখন শহরের মধ্যেই বিভিন্ন প্রজাতির মাছ পাওয়া যাচ্ছে। ইমনের উদ্যোগ দেখে তিনিও রঙিন মাছ পালন শুরু করেছেন।
ইমনের প্রতিবেশী মনির গাজীর মতে, রঙিন মাছ এখন অনেকের শখের অংশ হয়ে উঠেছে। স্থানীয়ভাবে এ ধরনের উদ্যোগ বাড়লে মানুষের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বেকারত্ব কমাতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
পরিবারও এখন যুক্ত
ইমনের বাবা মোফাজ্জল হোসেন জানান, শুরুর দিকে প্রায় সব মাছ মারা যাওয়ায় তারা চিন্তিত ছিলেন। তবে ইমন বারবার চেষ্টা করে নতুন করে শিখেছেন। এখন তিনি নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন।
তিনি বলেন, বর্তমানে তিনিও এবং ইমনের মা এই রঙিন মাছ চাষের কাজে যুক্ত হয়েছেন। খামার থেকে যে আয় হচ্ছে, তাতে তাদের সংসার ভালোভাবেই চলছে।
তরুণদের জন্য অনুপ্রেরণা
ইমনের সাফল্য দেখে স্থানীয় অনেক তরুণ চাকরির পেছনে না ছুটে অল্প জায়গায় রঙিন মাছ চাষের বিষয়ে আগ্রহী হচ্ছেন।
তরুণদের উদ্দেশে ইমন বলেন, শুধু চাকরির পেছনে না ছুটে নিজের আগ্রহের জায়গা থেকে কিছু করার চেষ্টা করা উচিত। রঙিন মাছ চাষ খুব বেশি জায়গা ছাড়াই শুরু করা যায়। তবে শুরু করার আগে ভালোভাবে শিখতে হবে এবং প্রথম দিকে সমস্যা এলেও ধৈর্য ধরে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
জেলা মৎস্য বিভাগও রঙিন মাছ চাষকে সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে দেখছে। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিজন কুমার নন্দী জানান, মেহেরাব ইমন মৎস্য অধিদপ্তরের নিবন্ধিত মৎস্য চাষি। তার উদ্যোগ প্রশংসনীয়। সঠিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও বাজারজাতকরণের সুযোগ পেলে তরুণরা এ খাত থেকে ভালো আয় করতে পারেন।
স্বপ্ন আরও বড়
বর্তমানে মাসে লাখ টাকারও বেশি আয় করছেন ইমন। তবে এখানেই থামতে চান না। খামারের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি আরও উন্নত ও আকর্ষণীয় জাতের রঙিন মাছ উৎপাদন করতে চান তিনি। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতে নিজস্ব ব্র্যান্ড তৈরির স্বপ্নও রয়েছে তার।
পাঁচ জোড়া মাছ দিয়ে শুরু করা ইমনের সেই শখ কয়েক বছরের ব্যবধানে পরিণত হয়েছে সফল বাণিজ্যিক উদ্যোগে। বাড়ির আঙিনার ছোট্ট খামার এখন তার জীবিকার পাশাপাশি স্থানীয় তরুণদের জন্যও হয়ে উঠেছে আত্মকর্মসংস্থানের একটি অনুপ্রেরণামূলক উদাহরণ।
প্রতিবেদকের নাম 




















