অর্থনীতি সচল রাখা, বন্ধ ও আংশিক বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় উৎপাদনে ফেরানো এবং কর্মসংস্থান বাড়ানোর লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা স্কিমে ২০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে বন্ধ শিল্প ও সেবা খাতের জন্য। এ অর্থ বিতরণের লক্ষ্যে গত জুনে পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করা হলেও ঋণের শর্ত ও ব্যবহারবিধির জটিলতায় প্রত্যাশিত গতি পাচ্ছে না অর্থ ছাড়।
বাংলাদেশ ব্যাংক গত মে মাসে শিল্প, কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রকল্প, রপ্তানি ও কর্মসংস্থানসহ অর্থনীতির ১৫টি খাতকে কেন্দ্র করে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা স্কিম ঘোষণা করে। এর একটি বড় অংশ রাখা হয় বন্ধ শিল্প ও সেবা খাতকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য। পরের মাসে এ খাতের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
তবে কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও এ স্কিমের আওতায় অর্থ বিতরণে তেমন অগ্রগতি দেখা যায়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বন্ধ শিল্প ও সেবা খাতে বিতরণ হয়েছে মাত্র ৮০০ কোটি টাকা।
এদিকে পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানি খাতের সংগঠন বিজিএমইএ, বিকেএমইএ এবং বিটিএমএ জানিয়েছে, কারখানার অস্তিত্ব, যন্ত্রপাতি ও জনবল এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা যাচাই করে তারা চার শতাধিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সুপারিশ করেছে।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, আবেদনকারীদের মধ্যে ২২০টি কারখানার বিষয়ে সংগঠনটি সুপারিশ করেছে। তবে শুধু সংগঠনের সুপারিশ থাকলেই ঋণ নিশ্চিত হচ্ছে না। আবার সুপারিশের বাইরে থেকেও অনেকে সরাসরি আবেদন করেছেন।
আবেদনকারীদের নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বিজিএমইএর সুপারিশ করা আংশিক বন্ধ ১৮৪টি কারখানার জন্য প্রায় ৭ হাজার ৭৭ কোটি টাকার ঋণের আবেদন করা হয়েছে। অন্যদিকে বিকেএমইএর আওতাধীন ১০৭টি কারখানার জন্য আবেদন করা হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৬৩০ কোটি টাকা।
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ব্যাংকগুলো যদি এই সুবিধার অর্থ যথাযথভাবে কাজে লাগিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহযোগিতা করে, তাহলে অনেক আংশিক চালু কারখানাই পূর্ণ উৎপাদনে ফিরতে পারবে এবং বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি কমবে।
তবে ব্যবসায়ী নেতাদের অভিযোগ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত শর্ত ও অর্থ ব্যবহারের বিধিনিষেধ প্রণোদনার ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, যেসব কারখানায় নতুন যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না, তাদের জন্য নীতিগত সহায়তা ও সংস্কার প্রয়োজন। সুশাসন ও কার্যকর নীতি নিশ্চিত করা গেলে কারখানাগুলোর উৎপাদন বাড়বে, চাহিদা তৈরি হবে এবং কর্মসংস্থানও বাড়বে বলে মনে করেন তিনি।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ঋণখেলাপিদের জন্য এই প্রণোদনা স্কিমের ঋণ পাওয়ার সুযোগ নেই। ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানকে আগে পুনঃতফসিলের মাধ্যমে ঋণের অবস্থার পরিবর্তন করতে হবে অথবা ‘ওয়ান টাইম এক্সিট’ সুবিধা নিতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র মোহাম্মদ শাহরিয়ার সিদ্দিকী বলেন, কোনো ঋণখেলাপি সরাসরি এই ঋণ পাওয়ার সুযোগ পাবেন না। তবে ‘ওয়ান টাইম এক্সিট’ সম্পন্ন করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এই ঋণের আওতায় আসতে পারবে। ঋণের অর্থ যে উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছে, সেটি যথাযথভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে কি না, তা বাংলাদেশ ব্যাংক সরেজমিনে পরিদর্শন করবে বলেও জানান তিনি।
ফলে একদিকে যোগ্য প্রতিষ্ঠান বাছাই এবং ব্যাংকের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার বিষয়টি সামনে রয়েছে, অন্যদিকে পুরোনো ঋণ নিয়মিত করার প্রক্রিয়ার মধ্যেই ব্যাংকগুলো কত দ্রুত প্রণোদনার অর্থ উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছাতে পারবে, তা নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। ফলে বন্ধ ও আংশিক বন্ধ শিল্প পুনরায় সচল করার লক্ষ্যে নেওয়া ২০ হাজার কোটি টাকার এই উদ্যোগ বাস্তবে কতটা গতি পাবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
প্রতিবেদকের নাম 


























