চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় দেশের ৩১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি। এসব প্রতিষ্ঠানের এমন ফলাফলের কারণ খতিয়ে দেখছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে না পারলে এসব প্রতিষ্ঠানের এমপিও সুবিধা বাতিল হতে পারে।
অনেক প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার্থীই ছিল হাতে গোনা
শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানগুলোর কয়েকটির চিত্র বেশ উদ্বেগজনক। কুমিল্লার নাঙ্গলকোটের দাসনাইপাড়া মহিলা দাখিল মাদ্রাসা থেকে এবার মাত্র একজন শিক্ষার্থী দাখিল পরীক্ষায় অংশ নেয়। ১২ জন শিক্ষক তাকে পড়ালেও সে পাস করতে পারেনি।
খুলনার আসমা সারোয়ার ইসলামিক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক রয়েছেন ১০ জন। অথচ এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিল মাত্র দুজন। তাদের কেউই পাস করেনি।
পঞ্চগড়ের বলরামহাট মডেল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে একজন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে ফেল করেছে। বোদা সর্দারপাড়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের তিন পরীক্ষার্থীর কেউই পাস করতে পারেনি।
জামালপুরের কদমতলী কারিপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে ১১ জন শিক্ষক তিনজন পরীক্ষার্থীকে পড়িয়েছেন। এরপরও একজনও পাস করতে পারেনি।
নরসিংদীর সুটুরিয়া ফজলুল হক খান দাখিল মাদ্রাসায় ১৮ জন শিক্ষক থাকলেও ১৬ পরীক্ষার্থীর কেউ পাস করেনি। কিশোরগঞ্জের জাঙ্গালিয়া ইউনিয়ন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে আটজন শিক্ষক থাকলেও পাঁচ পরীক্ষার্থীর কেউ পাস করতে পারেনি।
৩১২ প্রতিষ্ঠানে শূন্য পাস
শুধু এসব প্রতিষ্ঠান নয়, সারা দেশে ৩১২টি প্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষার্থীও পাস করেনি। গত বছর এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ১৩৪টি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে ১৭৮টি।
তবে এসব প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগেই পরীক্ষার্থীর সংখ্যা খুবই কম ছিল। অনেক প্রতিষ্ঠান থেকে ১৫ জনেরও কম শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। এমনকি শতাধিক প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার্থী ছিল মাত্র ৫ থেকে ৭ জন। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার্থী ছিল মাত্র একজন।
মাদ্রাসার সংখ্যাই বেশি
শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে মাদ্রাসার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। মোট ৩১২ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২২৬টি মাদ্রাসা।
এ ছাড়া সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের ৫৭টি এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ২৯টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। অর্থাৎ শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৭২ শতাংশই মাদ্রাসা।
এসব প্রতিষ্ঠানের বড় একটি অংশ উত্তরাঞ্চল, হাওর, চর, দক্ষিণাঞ্চল ও সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকায় অবস্থিত।
২২৬ মাদ্রাসা প্রধানকে শোকজ
দাখিল পরীক্ষায় কোনো শিক্ষার্থী পাস না করায় ২২৬টি মাদ্রাসার প্রধানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড।
১১ আগস্ট দেওয়া এক বিজ্ঞপ্তিতে মাদ্রাসা প্রধানদের লিখিত ব্যাখ্যাসহ বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দপ্তরে সরাসরি উপস্থিত হতে বলা হয়েছে।
অঞ্চল অনুযায়ী উপস্থিতির সময়ও নির্ধারণ করা হয়েছে। ঢাকা ও ময়মনসিংহ অঞ্চলের মাদ্রাসা প্রধানদের ১৬ আগস্ট, রাজশাহীর ১৭ আগস্ট এবং রংপুরের ১৮ আগস্ট উপস্থিত হতে বলা হয়েছে।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম ও সিলেটের ১৯ আগস্ট, খুলনা ও কুমিল্লার ২০ আগস্ট এবং বরিশালের ২৩ আগস্ট উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না পেলে এমপিও বাতিল
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডগুলো এসব প্রতিষ্ঠানের ফলাফল খতিয়ে দেখছে। প্রতিষ্ঠানগুলো কেন এমন খারাপ ফল করেছে, শিক্ষকরা নিয়মিত ক্লাস নেন কি না এবং শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কেমন—এসব বিষয়ও দেখা হবে।
কোনো প্রতিষ্ঠান সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে না পারলে তাদের এমপিও সুবিধা বাতিলের মতো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সৈয়দ আক্তারুজ্জামান জানিয়েছেন, যেসব প্রতিষ্ঠানে একাধিকবার শূন্য পাসের ঘটনা ঘটেছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শুধু শোকজ নয়, নিয়মিত নজরদারি চান শিক্ষাবিদরা
শিক্ষাবিদদের মতে, কোনো প্রতিষ্ঠানে শতভাগ শিক্ষার্থী ফেল করার পেছনে শুধু শিক্ষার্থীদের দায়ী করলে হবে না। শিক্ষক উপস্থিতি, নিয়মিত ক্লাস, পড়ানোর মান, শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া এবং প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা—সবকিছু যাচাই করা প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক অধ্যাপক মনে করেন, ৩১২টি প্রতিষ্ঠানে কেন একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি, তা তথ্যভিত্তিক ও বৈজ্ঞানিকভাবে অনুসন্ধান করা দরকার।
তিনি আরও বলেন, শহর ও গ্রামের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে বৈষম্য রয়েছে। এই বৈষম্য কমাতে প্রয়োজন সঠিক বিনিয়োগ, পরিকল্পনা এবং নিয়মিত মনিটরিং।
ঢাকা বোর্ডের ছয় প্রতিষ্ঠানেও কেউ পাস করেনি
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এবার ছয়টি প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। এগুলো হলো—
- টাঙ্গাইলের নাগরপুরের সলিমাবাদ আনোয়ার খান মডেল উচ্চ বিদ্যালয়
- ভূঞাপুরের গোবিন্দপুর উচ্চ বিদ্যালয়
- রাজবাড়ীর পাংশার বনগ্রাম আতারুননেসা উচ্চ বিদ্যালয়
- রাজবাড়ী সদরের জালদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়
- কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ার জঙ্গলিয়া ইউনিয়ন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়
- বিদেশ কেন্দ্রের বাংলাদেশের দোয়েল একাডেমি
শিক্ষাবিদদের মতে, শুধু কারণ দর্শানোর নোটিশ দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। নিয়মিত একাডেমিক অডিট, শিক্ষকদের উপস্থিতি ও পাঠদানের মান যাচাই এবং ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। তাহলেই দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার মান ধীরে ধীরে উন্নত করা সম্ভব হবে।
প্রতিবেদকের নাম 




















