চলমান পোশাকশ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনকে ন্যায্য ও যৌক্তিক উল্লেখ করে সরকার বলপ্রয়োগের মাধ্যমে তা থামানোর চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মো. নাহিদ ইসলাম।
বুধবার (৪ নভেম্বর) রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গাজীপুরে জাতীয় শ্রমিক শক্তি আয়োজিত গায়েবানা জানাজায় হামলায় গুরুতর আহত নেতাকর্মীদের দেখতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, শ্রমিকদের আন্দোলন শুরু হওয়ার এক সপ্তাহ পর মজুরি বোর্ড গঠন করা হলেও পরবর্তী তিন দিন কোনো সভা হয়নি। পরিস্থিতি বিবেচনায় বুধবার প্রথম সভা হয়েছে। এতে সরকারের অবহেলা স্পষ্ট হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, সরকার এখনো আন্দোলনকে ন্যায্য ও গণতান্ত্রিক দাবি হিসেবে স্বীকৃতি না দিয়ে বিভিন্ন ষড়যন্ত্রতত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছে।
তিনি দাবি করেন, আন্দোলনে সহিংসতার সূচনা করেছে বিএনপি। শ্রমিকদের ওপর রাষ্ট্রীয় ও দলীয় সহিংসতা চালানো হচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, গত মঙ্গলবার বিএনপির লোকজন হকিস্টিক ও স্টাম্প নিয়ে রাস্তায় নেমে শ্রমিকদের মারধর করেছেন। দলীয়ভাবে সহিংস বাহিনী ব্যবহার করে আন্দোলন নিয়ন্ত্রণ ও দমনের চেষ্টা চলছে।
নাহিদ ইসলামের অভিযোগ, পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী শ্রমিক কলোনিতে অভিযান চালিয়ে শ্রমিকদের খুঁজছে ও গ্রেপ্তার করছে। অনেক শ্রমিকের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, অতীতের শেখ হাসিনা সরকারের আমলে যেভাবে শ্রমিক আন্দোলন দমন করা হতো, বর্তমান সরকারও একই ধরনের কর্তৃত্ববাদী পদ্ধতি অনুসরণ করছে।
পোশাকশ্রমিক তৌফিকের মৃত্যুর স্মরণে আয়োজিত গায়েবানা জানাজায় হামলার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে পুলিশ, বিজিবি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হামলা চালিয়েছে। গুলি ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়েছে। এতে জাতীয় শ্রমিক শক্তির আহ্বায়কসহ নারী-পুরুষ মিলিয়ে প্রায় ১৭ জন শ্রমিক আহত হয়েছেন। আহতদের কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর এবং তাঁরা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আন্দোলনগুলোকে জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করা হতো। এখন বিএনপি বিভিন্ন আন্দোলনে আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলে আন্দোলনের ন্যায্যতা প্রশ্নবিদ্ধ করছে। তাঁর মতে, সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
আওয়ামী লীগের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, আওয়ামী লীগ ফ্যাসিস্ট এবং বাংলাদেশের শত্রু। তারা যেকোনো পরিস্থিতির সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করবে। তবে তাঁর প্রশ্ন, সেই সুযোগ কারা তৈরি করেছে? গত সাত মাস ধরে বিএনপি সেই সুযোগ করে দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। গাজীপুর, সাভারসহ বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগকে প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগও তোলেন নাহিদ।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, সাভারে এনসিপির পদযাত্রা শুরুর সময় ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় সঠিক বিচার হয়নি। এসব ক্ষেত্রে বিএনপির লোকজন আওয়ামী লীগকে প্রশ্রয় দিয়েছে এবং বিচারের প্রশ্নে আপস করেছে বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর মতে, ফ্যাসিবাদবিরোধী জাতীয় ঐকমত্য ভঙ্গ ও প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘনের দায় সরকার ও বিএনপিকে নিতে হবে।
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি মেনে নিয়ে তাঁদের সঙ্গে আন্তরিক আলোচনা করতে হবে। কোনো ধরনের টালবাহানা বা প্রতারণা করা উচিত নয়। ইতোমধ্যে গঠিত মজুরি বোর্ডের ওপর শ্রমিকদের আস্থা নেই বলেও দাবি করেন তিনি।
বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেন, সরকারের আশ্বাসের প্রতিও শ্রমিকদের আস্থা নেই। কারণ, সরকার আগে আলোচনার পরিবর্তে নির্যাতন, দমন-পীড়ন ও গ্রেপ্তারের পথ বেছে নিয়েছে। নির্বাচনের আগে সরকার জুলাই সনদ মেনে নেওয়া ও বাস্তবায়নের কথা বললেও নির্বাচনের পর অবস্থান থেকে সরে এসেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
শ্রমিকদের ন্যায্য, অহিংস ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, আওয়ামী লীগ সহিংসতার মাধ্যমে আন্দোলনের সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে, অন্যদিকে বিএনপি রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের মাধ্যমে শ্রমিকদের দমন করতে পারে। এসবের বিরুদ্ধে শ্রমিকদের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
শ্রমিকদের পক্ষে তিন দফা দাবি
নাহিদ ইসলাম শ্রমিকদের পক্ষে তিনটি দাবি তুলে ধরেন:
১. নিহত শ্রমিক তৌফিককে আইএলও কনভেনশন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এবং সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
২. গ্রেপ্তার ও অন্যায়ভাবে দায়ের করা সব মামলা প্রত্যাহার করে শ্রমিক নেতা ও কর্মীদের নিঃশর্ত মুক্তি দিতে হবে।
৩. আন্দোলন শেষে শ্রমিকদের ছাঁটাই, মামলা দিয়ে গ্রেপ্তার, ভয়ভীতি প্রদর্শন বা ব্ল্যাকলিস্ট করা যাবে না। তাঁদের হুমকি দেওয়া, আইনি হয়রানি করা কিংবা চাকরিচ্যুত করা যাবে না।
তিনি বলেন, শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা করে তাঁদের যৌক্তিক দাবিগুলো আন্তরিকভাবে মেনে নেওয়ার ঘোষণা দিতে হবে। এই আন্দোলন মালিকদের বিরুদ্ধে নয়। বাংলাদেশের পোশাকশিল্প অন্যতম প্রধান রপ্তানি খাত। শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে শ্রমিকদেরও সুরক্ষা দিতে হবে এবং তাঁদের উৎপাদনশীল অবস্থায় রাখতে হবে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, শ্রমিকদের এই আন্দোলন বেঁচে থাকার লড়াই। মালিক, পোশাকশিল্পের শ্রমিক ও রাজনৈতিক পক্ষগুলোকে নিয়ে সরকারকে অবিলম্বে সুষ্ঠু সমাধানে পৌঁছাতে হবে।
প্রতিবেদকের নাম 

























