ভারত ও চীনের দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। দুই দেশের শীর্ষ কূটনৈতিক পর্যায়ের সাম্প্রতিক বৈঠকের পর প্রশ্ন উঠেছে—সীমান্ত নির্ধারণে কি শেষ পর্যন্ত চীনের প্রস্তাবের পথে হাঁটতে রাজি হচ্ছে ভারত?
আসন্ন ব্রিকস সম্মেলনের আগে বেইজিংয়ে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইয়ের বৈঠকে সীমান্ত ইস্যু নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকের পর দুই দেশের সরকারি বিবৃতির ভাষায় কিছুটা মিল থাকায় কূটনৈতিক মহলে নতুন করে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা।
প্রায় সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার সীমান্ত নিয়ে বিরোধ
ভারত ও চীনের মধ্যে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ রয়েছে। এই সীমান্তকে সাধারণত তিনটি অংশে ভাগ করা হয়—পশ্চিম, মধ্য ও পূর্বাঞ্চল।
পশ্চিমাঞ্চলে রয়েছে লাদাখ, মধ্যাঞ্চলে উত্তরাখণ্ড ও হিমাচল প্রদেশ এবং পূর্বাঞ্চলে সিকিম ও অরুণাচল প্রদেশ।
চীনের পুরোনো প্রস্তাব কী?
চীন গত কয়েক বছর ধরে এমন একটি পদ্ধতির কথা বলে আসছে, যেখানে পুরো সীমান্ত বিরোধ একসঙ্গে সমাধানের পরিবর্তে তুলনামূলক কম বিরোধপূর্ণ অংশগুলো আগে নির্ধারণ করা হবে।
অর্থাৎ, যেসব এলাকায় দ্রুত সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব, প্রথমে সেসব অংশের সীমা নির্ধারণ করা হবে। পরে অন্যান্য বিরোধপূর্ণ অঞ্চল নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া হবে।
কূটনৈতিক মহলে এই পদ্ধতিকে সীমান্ত সমস্যাকে ধাপে ধাপে সমাধানের কৌশল হিসেবে দেখা হয়।
ভারতের অবস্থানে কি পরিবর্তন আসছে?
এতদিন এই পদ্ধতি নিয়ে ভারতের অবস্থান ছিল সতর্ক। কারণ ২০০৫ সালে ভারত ও চীনের মধ্যে স্বাক্ষরিত সীমান্ত-সংক্রান্ত চুক্তিতে সীমান্ত সমস্যার সামগ্রিক সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
ভারতের আশঙ্কা ছিল, সীমান্তের পৃথক অংশ আলাদাভাবে সমাধান করতে গেলে পুরো সমস্যাটি খণ্ডিত হয়ে যেতে পারে।
তবে অজিত দোভাল ও ওয়াং ইয়ের সাম্প্রতিক বৈঠকের পর ভারতের সরকারি বিবৃতিতে সীমান্ত নির্ধারণের কাজ এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে দুই দেশের আলোচনার কথা বলা হয়েছে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতেও সীমান্ত পুনর্বিন্যাস নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
তাহলে কি চীনের দাবি মেনে নিচ্ছে ভারত?
এখনই এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। সীমান্ত নির্ধারণ নিয়ে আলোচনা হওয়া মানেই কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের ওপর ভারতের দাবি প্রত্যাহার করা নয়।
তবে ভারতের বিবৃতিতে এবার সীমান্ত সমস্যার সামগ্রিক সমাধানের কাঠামোর বিষয়টি স্পষ্টভাবে সামনে না আসায় কূটনৈতিক মহলে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—বিরোধ কম থাকা অঞ্চলগুলো নিয়ে কি ভারত নতুন করে সমঝোতার পথে হাঁটছে?
এটি চীনের পুরোনো প্রস্তাবের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেটিও এখন আলোচনার বিষয়।
২০২০ সালের সংঘাতের পর নতুন সমীকরণ
২০২০ সালের পূর্ব লাদাখের সংঘাতের পর ভারত-চীন সম্পর্কে বড় ধরনের টানাপোড়েন তৈরি হয়। এরপর সামরিক ও কূটনৈতিক পর্যায়ে একাধিক বৈঠকের মাধ্যমে সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা চালানো হয়েছে।
সীমান্তে উত্তেজনা কমানোর পাশাপাশি দুই দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে অজিত দোভাল ও ওয়াং ইয়ের বৈঠককে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে কূটনৈতিক মহল। বিশেষ করে সীমান্ত নির্ধারণের বিষয়টি সরাসরি আলোচনায় আসায় মনে করা হচ্ছে, দীর্ঘদিনের বিরোধ মেটাতে নতুন কোনো পথ খুঁজছে দুই দেশ।
তবে শেষ পর্যন্ত সেই পথ ভারতের জাতীয় স্বার্থকে কতটা অগ্রাধিকার দেয়, নাকি চীনের দীর্ঘদিনের প্রস্তাবই নতুন কাঠামোয় সামনে আসছে—এখন সেটিই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
প্রতিবেদকের নাম 




















