বাংলাদেশে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও বিচারকদের জবাবদিহি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে। বিচারকরা স্বাধীনভাবে বিচারিক সিদ্ধান্ত নেবেন—এটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি কোনো বিচারকের বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়ম, অসদাচরণ, পক্ষপাত বা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার অভিযোগ উঠলে তার জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি।
সম্প্রতি ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলা এবং পিরোজপুরের একটি হত্যা মামলায় নিম্ন আদালতের দুই বিচারকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার পর বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে।
নুসরাত হত্যা মামলায় বিচারকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
২০১৯ সালে ফেনীর নিম্ন আদালত নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় ১৬ আসামিকেই মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল। তবে সম্প্রতি হাইকোর্টের রায়ে সেই সাজায় বড় পরিবর্তন এসেছে।
হাইকোর্ট দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছে। চারজনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং ১০ আসামিকে খালাস দেওয়া হয়েছে।
রায় পর্যালোচনা করতে গিয়ে হাইকোর্ট সংশ্লিষ্ট বিচারকের বিচারিক মনোভাব ও দায়িত্ব পালনের পদ্ধতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। একটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সব আসামিকে একইভাবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিষয়টিকে আদালত অত্যন্ত গুরুতর বিচারিক ত্রুটি হিসেবে দেখেছে।
এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট বিচারকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আইন মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট।
পিরোজপুরের মামলাতেও অনিয়ম
অন্য একটি ঘটনায় পিরোজপুরের প্রায় দেড় দশক আগের হত্যা মামলায় আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নথিবদ্ধ করার ক্ষেত্রে নিয়ম না মানার অভিযোগ উঠে আসে।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, জবানবন্দি গ্রহণের সময় ফৌজদারি কার্যবিধির নির্ধারিত বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি।
এ ঘটনায় বিচারক মো. কবির উদ্দিন প্রামাণিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আইন মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট।
নিম্ন আদালতের বিচারকদের জবাবদিহি কীভাবে হয়?
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী অধস্তন আদালতগুলোর ওপর হাইকোর্ট বিভাগের তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।
সংবিধানের ১০৯ অনুচ্ছেদে হাইকোর্ট বিভাগের অধস্তন আদালত ও ট্রাইব্যুনালের ওপর তত্ত্বাবধানের ক্ষমতার কথা বলা হয়েছে। ফলে কোনো নিম্ন আদালতের বিচারকের বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়ম বা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার অভিযোগ উঠলে হাইকোর্ট প্রয়োজনীয় বিচারিক ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিতে পারে।
অভিযোগের ধরন ও গুরুত্ব অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট বিচারককে সতর্ক করা, ভর্ৎসনা করা, তদন্তের আওতায় আনা কিংবা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার মতো পদক্ষেপের সুযোগ রয়েছে।
শুধু রায় বাতিল হলেই কি বিচারকের শাস্তি হয়?
না। কোনো বিচারকের দেওয়া রায় উচ্চ আদালতে বাতিল বা পরিবর্তিত হওয়া মানেই ওই বিচারক অপরাধ করেছেন—এমন নয়।
বিচারিক ব্যবস্থায় আপিল ও রিভিশনের মাধ্যমে নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্ত সংশোধনের সুযোগ রয়েছে। উচ্চ আদালত নিম্ন আদালতের কোনো সিদ্ধান্ত ভুল মনে করলে সেটি বাতিল বা পরিবর্তন করতে পারে।
তবে কোনো সিদ্ধান্তের পেছনে যদি গুরুতর অবহেলা, আইন না মানা, পক্ষপাত, অসদাচরণ বা বিচারিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার মতো বিষয় পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট বিচারকের বিরুদ্ধে আলাদা জবাবদিহির প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।
উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের ক্ষেত্রে কী হয়?
উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের জবাবদিহির সাংবিধানিক কাঠামো আলাদা। তাদের অযোগ্যতা বা অসদাচরণের অভিযোগের ক্ষেত্রে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এই কাউন্সিল বিচারপতিদের বিরুদ্ধে ওঠা গুরুতর অভিযোগ পরীক্ষা ও তদন্তের সাংবিধানিক ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে। অভিযোগের সত্যতা ও পরিস্থিতি অনুযায়ী সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি আসে।
অর্থাৎ, নিম্ন আদালতের বিচারকদের ক্ষেত্রে হাইকোর্টের তদারকি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের ক্ষেত্রে রয়েছে পৃথক সাংবিধানিক জবাবদিহির কাঠামো।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বনাম জবাবদিহি
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা যেমন প্রয়োজন, তেমনি সেই স্বাধীনতার সঙ্গে জবাবদিহির ভারসাম্যও থাকতে হবে।
একজন বিচারককে রাজনৈতিক, সামাজিক কিংবা অন্য কোনো ধরনের চাপের বাইরে থেকে বিচার করার সুযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে বিচারিক দায়িত্ব পালনে গুরুতর অনিয়ম হলে তার বিরুদ্ধে যথাযথ প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়ার ব্যবস্থাও থাকতে হবে।
কারণ বিচারিক স্বাধীনতার অর্থ জবাবদিহির ঊর্ধ্বে থাকা নয়।
নুসরাত হত্যা মামলায় নিম্ন আদালতের রায় নিয়ে হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ এবং পিরোজপুরের মামলায় প্রক্রিয়াগত অনিয়মের ঘটনায় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ—দুটি ঘটনাই দেখিয়েছে, বিচারিক সিদ্ধান্তের পাশাপাশি বিচারকের দায়িত্ব পালনের পদ্ধতিও উচ্চ আদালতের পর্যালোচনার আওতায় থাকতে পারে।
সংক্ষেপে
বাংলাদেশে বিচারকদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিচারকের পদ ও আদালতের স্তর অনুযায়ী প্রক্রিয়া ভিন্ন। নিম্ন আদালতের বিচারকদের ওপর হাইকোর্টের তদারকি রয়েছে। অন্যদিকে উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের ক্ষেত্রে সাংবিধানিকভাবে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের ব্যবস্থা রয়েছে।
ফলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রেখেই গুরুতর অনিয়ম, অসদাচরণ ও দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য দেশের আইন ও সংবিধানে বিভিন্ন স্তরের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
প্রতিবেদকের নাম 



















