ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক চাপের পাশাপাশি এবার অর্থনৈতিক চাপ আরও জোরদার করছে যুক্তরাষ্ট্র। হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে তেহরানকে বাধ্য করা, ইরানের তেল আয় কমানো এবং দেশটির ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়ানোই ওয়াশিংটনের এই কৌশলের মূল লক্ষ্য বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
নিষেধাজ্ঞা, নৌ অবরোধ ও আর্থিক চাপের মাধ্যমে ইরানকে চাপে রাখার চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে কয়েক দশক ধরে নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া তেহরান কতটা দ্রুত এই চাপে নতি স্বীকার করবে, তা নিয়ে রয়েছে বড় অনিশ্চয়তা।
সামরিক চাপ থেকে অর্থনৈতিক কৌশলে কেন?
যুক্তরাষ্ট্রের এই কৌশল পরিবর্তনের পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। এর মধ্যে অন্যতম হলো দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অভিযানে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও নির্ভুল নির্দেশিত গোলাবারুদের ওপর চাপ তৈরি হওয়া।
স্টিমসন সেন্টারের ন্যাশনাল সিকিউরিটি রিফর্ম প্রোগ্রামের পরিচালক ড্যান গ্রেজিয়ারের মতে, ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সময় সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সহজ নয়। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি ইউরোপ ও এশিয়াতেও ওয়াশিংটনের সামরিক প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতির বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, দেশটি দ্রুত অস্ত্রের মজুত পুনর্গঠন করছে।
হরমুজ প্রণালি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মধ্যে সংযোগকারী হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। স্বাভাবিক সময়ে বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস বাণিজ্যের বড় একটি অংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
ফলে প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে শুধু ইরান নয়, বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ও দামের ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
ইরানের জন্যও হরমুজ গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত হাতিয়ার। প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে দেশটির নিজস্ব তেল রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হয়।
সরাসরি অভিযানেও ঝুঁকি
হরমুজ পুরোপুরি খুলতে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালালে ইরানের পাল্টা হামলার আশঙ্কা রয়েছে। ইরানের উপকূল ও দ্বীপগুলো থেকে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, মাইন ও ছোট নৌযানের মাধ্যমে জাহাজ চলাচলে হুমকি তৈরি করা সম্ভব।
তাই একবার সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে জলপথ খুলে দিলেই দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে।
এই কারণেই নিষেধাজ্ঞা ও নৌ অবরোধের মাধ্যমে ইরানের অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ানোকে তুলনামূলকভাবে কার্যকর বিকল্প হিসেবে দেখছে ওয়াশিংটন।
ইরান কি চাপে নতি স্বীকার করবে?
এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। ইরান ১৯৭৯ সালের পর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রয়েছে। ফলে নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলায় দেশটির অভিজ্ঞতা রয়েছে।
চীনের সঙ্গে বাণিজ্য, বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থা এবং তেল বিক্রির বিভিন্ন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তেহরান দীর্ঘস্থায়ী চাপ সামাল দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে।
অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ইরানের অর্থনীতিকে দুর্বল করলেও অতীতে তা দেশটির সরকারকে নীতিগতভাবে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে পারেনি। তাই এবারও মার্কিন চাপ কত দ্রুত কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ফল দেবে, তা নিশ্চিত নয়।
ওয়াশিংটনের মূল হিসাব
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলের পেছনে তিনটি প্রধান লক্ষ্য দেখা যাচ্ছে—হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া, ইরানের তেল আয় কমানো এবং তেহরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনা।
এর পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অভিযানে মার্কিন অস্ত্রভান্ডারের ওপর তৈরি হওয়া চাপও কৌশল পরিবর্তনের সম্ভাব্য একটি কারণ। তবে এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কৌশলের একমাত্র কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
সূত্র: আলজাজিরা
প্রতিবেদকের নাম 



















