বহুল আলোচিত কলেজছাত্রী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য হাফিজুর রহমান হাইকোর্টের দেওয়া জামিনে কারামুক্ত হয়েছেন। মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) সন্ধ্যা ৭টা ৫ মিনিটে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়।
কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মো. শাহ আলম খান বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, হাইকোর্টের জামিনের আদেশ পাওয়ার পর সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে হাফিজুর রহমানকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
এর আগে গত রোববার বিচারপতি জাকির আহমেদ ও বিচারপতি সাথীকা হোসাইন সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ শুনানি শেষে তার জামিন মঞ্জুর করেন।
প্রায় এক দশক পর গ্রেপ্তার
দীর্ঘ প্রায় ১০ বছর পর চলতি বছরের ২২ এপ্রিল রাতে ঢাকার কেরানীগঞ্জে নিজ বাসা থেকে তনু হত্যা মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে হাফিজুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
পরদিন তাকে কুমিল্লার আদালতে হাজির করা হলে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করে পিবিআই। আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ড চলাকালে তার ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয় এবং সেই প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে।
তদন্তে নতুন অগ্রগতি
মামলার তদন্তে নতুন অগ্রগতির অংশ হিসেবে তনুর পোশাক থেকে পাওয়া আলামতের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে আরও দুই সন্দেহভাজনের রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে ডিএনএ পরীক্ষার অনুমতি দিয়েছেন আদালত।
পিবিআই সূত্র জানায়, তনুর পোশাক থেকে সংগৃহীত আলামতের বিশ্লেষণে একাধিক পুরুষের পূর্ণাঙ্গ ডিএনএ প্রোফাইল পাওয়া গেছে। সেই প্রোফাইলের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে আদালতের অনুমতি নিয়ে নতুন দুই সন্দেহভাজনের ডিএনএ পরীক্ষা করা হবে।
গত ১৬ জুলাই কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোমিনুল হক এ সংক্রান্ত আবেদন মঞ্জুর করেন।
যাদের ডিএনএ পরীক্ষা হবে
ডিএনএ পরীক্ষার অনুমতি পাওয়া দুই ব্যক্তি হলেন—
- কুমিল্লা সেনানিবাসের সাবেক সৈনিক মো. জাহিদুল ইসলাম (৪১); তার বাড়ি সিরাজগঞ্জের কাজীপুর উপজেলার মেঘাই গ্রামে।
- ফয়সাল আহমেদ (রাব্বী) (৩২); তার বাড়ি কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার লক্ষ্মীনগর (রাজাপাড়া) এলাকায়।
তদন্তের স্বার্থে দ্বিতীয় ব্যক্তির বিরুদ্ধে সন্দেহের নির্দিষ্ট কারণ প্রকাশ করেনি পিবিআই।
তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক মো. তারিকুল ইসলাম জানান, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী তাদের রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে তুলনামূলক ডিএনএ পরীক্ষা করা হবে। বর্তমানে তারা কোথায় অবস্থান করছেন, সেটিও নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।
দুই পলাতকের বিরুদ্ধে রেড নোটিশের উদ্যোগ
এর আগে গত ৮ জুন তনু হত্যাকাণ্ডের সময় কুমিল্লা সেনানিবাসে কর্মরত সন্দেহভাজন সার্জেন্ট জাহিদুজ্জামান (জাহিদ) এবং সৈনিক শাহীন আলমের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত। একই সঙ্গে তাদের গ্রেপ্তারে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারির নির্দেশ দেওয়া হয়। পিবিআই জানিয়েছে, দুজনই বর্তমানে পলাতক।
তনু হত্যা মামলা
২০১৬ সালের ২০ মার্চ কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকায় টিউশনি করতে গিয়ে নিখোঁজ হন ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু। পরদিন সেনানিবাসের একটি জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় তার বাবা ইয়ার হোসেন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন।
মামলাটি প্রথমে থানা-পুলিশ, পরে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) এবং সিআইডি তদন্ত করলেও হত্যার রহস্য উদ্ঘাটিত হয়নি। ২০১৭ সালে সিআইডির ডিএনএ পরীক্ষায় তনুর পোশাক থেকে তিনজন পুরুষের শুক্রাণুর উপস্থিতি শনাক্ত হলেও তা সন্দেহভাজনদের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়নি।
পরে ২০২০ সালের ২১ অক্টোবর মামলাটি সিআইডি থেকে পিবিআই সদর দপ্তরে হস্তান্তর করা হয়। বর্তমানে মামলার তদন্ত করছে পিবিআই।
প্রতিবেদকের নাম 



















