যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ ও কঠোর নিষেধাজ্ঞার প্রভাবে ইরানের ওষুধ শিল্প মারাত্মক চাপে পড়েছে। এরই মধ্যে দেশটিতে কিছু ওষুধের দাম তিনগুণেরও বেশি বেড়েছে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় কিছু ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী সহজে না পাওয়ায় রোগী ও তাদের পরিবারের দুর্ভোগও বাড়ছে।
আমেরিকা ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের সাত মাসে ইরানের অর্থনৈতিক সংকট আরও গভীর হয়েছে। বেকারত্ব বাড়ার পাশাপাশি দেশটির মুদ্রার মূল্য চলতি সপ্তাহে সর্বকালের সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর প্রভাব পড়েছে খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারেও।
ফার্মেসিতে মিলছে না প্রয়োজনীয় সব ওষুধ
ইরানের হাসপাতালগুলোতে এখনো বড় ধরনের ওষুধ সংকটের ব্যাপক লক্ষণ দেখা না গেলেও সাধারণ ফার্মেসিগুলোতে পরিস্থিতি ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
তেহরানের ওয়েল্ডার গোলামরেজা রহমানি ও তার স্ত্রী সম্প্রতি তাদের পেটে সমস্যায় ভোগা ১২ বছর বয়সী মেয়ের জন্য চার ধরনের ওষুধের প্রেসক্রিপশন নিয়ে দুই দিন ধরে একাধিক ফার্মেসিতে ঘুরেছেন।
রহমানি বলেন, প্রতিটি ফার্মেসিতে এক বা দুটি ওষুধ পাওয়া গেলেও সবগুলো একসঙ্গে পাওয়া যাচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত একটি ওষুধ তারা কোথাও খুঁজে পাননি।
ওষুধের সন্ধানে দুই দিন ঘুরতে গিয়ে রহমানিকে কাজেও যেতে পারেননি। ফলে চিকিৎসার খরচের পাশাপাশি তাকে হারাতে হয়েছে দুই দিনের মজুরিও।
দেশেই উৎপাদন হলেও আমদানির ওপর নির্ভরতা
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইরান তার প্রয়োজনের ৮০ শতাংশেরও বেশি ওষুধ দেশে উৎপাদন করে। তবে এসব ওষুধের বড় একটি অংশ তৈরিতে প্রয়োজনীয় কাঁচামালের জন্য ইরানকে আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়।
তেহরান ফার্মাসিউটিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য বাহমান সাবুর স্থানীয় গণমাধ্যমকে জানান, যুদ্ধের আগে ইরানের বেশিরভাগ ওষুধ ও ঔষধি উপাদান সমুদ্রপথে আমদানি করা হতো। কিন্তু মার্কিন নৌ-অবরোধের কারণে সেই সরবরাহব্যবস্থা বড় ধরনের বাধার মুখে পড়েছে।
এরপর চিকিৎসা সামগ্রীর আমদানিকারকরা তুলনামূলক ব্যয়বহুল আকাশপথে পণ্য আনার চেষ্টা করেন। কিন্তু ইরানের কয়েকটি এয়ারলাইনসের ওপর নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরোপের ফলে সেই পথও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট স্থগিতও হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞার ‘পরোক্ষ’ প্রভাব
যুক্তরাজ্যের এসেক্স ইউনিভার্সিটির স্কুল অব হেলথ অ্যান্ড সোশ্যাল কেয়ারের অধ্যাপক রেজা মাজেদজাদেহ বলেন, মার্কিন নিষেধাজ্ঞাগুলো সরাসরি ইরানের ওষুধ খাতকে লক্ষ্য করে দেওয়া না হলেও দীর্ঘদিনের আর্থিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ওষুধ সরবরাহব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
তার মতে, আন্তর্জাতিক ব্যাংক ও কোম্পানিগুলো নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ার আশঙ্কায় ইরানের সঙ্গে লেনদেনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্ক থাকে। ফলে আইনগতভাবে কোনও ওষুধ বিক্রি বৈধ হলেও বাস্তবে সেই লেনদেন সম্পন্ন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, ইরানের কাছে ওষুধ বিক্রি করা বৈধ হতে পারে, কিন্তু কোনো ব্যাংক অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে অস্বীকৃতি জানাতে পারে। একইভাবে কোনো ওষুধ প্রস্তুতকারক বা শিপিং কোম্পানি ইরানের সঙ্গে ব্যবসাকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করে সরে দাঁড়াতে পারে।
ফলে কাগজে-কলমে বৈধ একটি বাণিজ্যিক লেনদেন বাস্তবে আর সম্পন্ন হয় না।
হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ওষুধ কারখানা
ইরানের ওষুধ উৎপাদন কতটা কমেছে, সে বিষয়ে দেশটির সরকার নির্দিষ্ট কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি। তবে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিমান হামলায় ৪০টির বেশি ফার্মাসিউটিক্যাল কারখানা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ক্যানসারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত কিছু ওষুধ উৎপাদনকারী কারখানাও রয়েছে। ফলে যুদ্ধের সরাসরি প্রভাবও দেশটির ওষুধ উৎপাদনব্যবস্থায় পড়েছে।
অর্থসংকটে ফার্মেসিগুলোও
ওষুধ সরবরাহের পাশাপাশি অর্থের সংকটও ইরানের ফার্মেসিগুলোর জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নগদ অর্থের ঘাটতির কারণে অনেক ফার্মেসি প্রয়োজনীয় পরিমাণ ওষুধ মজুত রাখতে পারছে না।
সংসদীয় স্বাস্থ্য কমিটির সদস্য মোহাম্মদ জামালিয়াট জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতির কারণে বিমা কোম্পানিগুলো ফার্মেসিগুলোর ওষুধের বিল পরিশোধে দীর্ঘ সময় দেরি করছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই বকেয়া পরিশোধে সময় লাগছে নয় মাস পর্যন্ত।
ফলে একদিকে আমদানি ও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে অর্থপ্রবাহের সংকটে ফার্মেসিগুলোর ওপরও বাড়ছে চাপ। সব মিলিয়ে ইরানের সাধারণ রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ সংগ্রহ এখন আগের চেয়ে আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
প্রতিবেদকের নাম 




















