সরকারি কেনাকাটায় দীর্ঘদিনের প্রচলিত নিয়মে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন থেকে সরকারি দরপত্রে অংশ নিতে আগের কাজের অভিজ্ঞতা ও নির্দিষ্ট পরিমাণ বার্ষিক টার্নওভারের শর্ত আগের মতো কঠোরভাবে প্রযোজ্য হবে না। পাশাপাশি শুধু সর্বনিম্ন দর নয়, পণ্য ও সেবার গুণগত মান, টেকসইতা, পরিবেশগত প্রভাব ও শক্তি দক্ষতাকেও মূল্যায়নের সুযোগ রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া অস্বাভাবিক কম দর দিলে তা বিশেষভাবে যাচাই এবং অনিয়মে জড়িত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে সরকারি ক্রয়ে নিষিদ্ধ করার বিধান করা হয়েছে।
পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন, ২০০৬ সংশোধন করে ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬’ জারি করেছে সরকার। সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) অধ্যাদেশটি গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়।
সংশোধিত আইনে দরপত্রে অংশগ্রহণের যোগ্যতার ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এতদিন সরকারি কাজের দরপত্রে অংশ নিতে প্রতিষ্ঠানের পূর্ব অভিজ্ঞতা ও নির্দিষ্ট মাত্রার বার্ষিক টার্নওভার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ছিল। নতুন ব্যবস্থায় এসব শর্ত শিথিল করা হয়েছে।
এর ফলে দীর্ঘদিন সরকারি কাজ করা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি নতুন প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোক্তাদের সরকারি ক্রয়ে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়বে। তবে কাজের ধরন, জটিলতা ও ঝুঁকি বিবেচনায় প্রয়োজন হলে নির্দিষ্ট ক্রয়ের ক্ষেত্রে বিশেষ যোগ্যতার শর্ত আরোপ করা যাবে।
সংশোধিত আইনে দেশীয় শিল্প ও প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। এ জন্য ‘জাতীয় অগ্রাধিকার সত্তা’ নামে নতুন সংজ্ঞা যুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি সরবরাহকারী, ঠিকাদার, সেবাদাতা ও পরামর্শককে সম্মিলিতভাবে বোঝাতে ‘ইকোনমিক অপারেটর’ নামে নতুন সংজ্ঞা সংযোজন করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক দরপত্রের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিদেশি ঠিকাদার বা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে অংশ নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দরপত্রের তথ্য প্রচার ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক প্রকিউরমেন্ট পোর্টাল ব্যবহারের বিষয়টিও স্পষ্ট করা হয়েছে।
নতুন বিধানে নির্দিষ্ট পণ্য ও সেবা কেনার ক্ষেত্রে শুধু কারিগরি সক্ষমতা ও আর্থিক দর নয়, টেকসইতার বিষয়ও মূল্যায়ন করা যাবে। কোনো পণ্য বা সেবা পরিবেশের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, কতটা শক্তি সাশ্রয়ী এবং দীর্ঘমেয়াদে কতটা কার্যকর—এসব বিষয়ও মূল্যায়নের আওতায় আনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে সরকারি ক্রয়ে শুধু কম দামের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি সুবিধাকেও বিবেচনায় নেওয়া যাবে।
পণ্য, কার্য ও ভৌতসেবা কেনার ক্ষেত্রে অনুপাতভিত্তিক ‘রেটেড ক্রাইটেরিয়া’ ব্যবহার করে মূল্যায়নের বিধানও যুক্ত হয়েছে। এতে নির্ধারিত বিভিন্ন মানদণ্ডের ভিত্তিতে দরপত্র মূল্যায়ন করা যাবে।
কোনো দরদাতা সরকারি দাপ্তরিক প্রাক্কলিত মূল্যের তুলনায় অস্বাভাবিক কম দর দিলে তা বিশেষভাবে যাচাই করতে হবে।
দরপত্র মূল্যায়নে প্রথমে দরদাতার যোগ্যতা ও দরপত্রের শর্ত পূরণ হয়েছে কি না যাচাই করা হবে। এরপর কারিগরি প্রস্তাব মূল্যায়ন করা হবে। কারিগরি মূল্যায়নে উত্তীর্ণ দরদাতাদের আর্থিক প্রস্তাব উন্মুক্ত ও মূল্যায়ন করা হবে। সবশেষে কারিগরি ও আর্থিক বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করা হবে।
দুর্নীতি, জালিয়াতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, অসাধু প্রভাব বিস্তার, প্রলোভন বা চুক্তির শর্ত লঙ্ঘনের মতো ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে সরকারি কেনাকাটা থেকে নিষিদ্ধ করার বিধান রাখা হয়েছে।
অপরাধের ধরন, গুরুত্ব ও আর্থিক ক্ষতির বিষয় বিবেচনায় কোনো নির্দিষ্ট ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে অথবা সরকারের অধীন সব ক্রয়কারীর ক্ষেত্রে দরপত্রে অংশগ্রহণ থেকে অযোগ্য ঘোষণা করা যাবে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন স্থগিত বা বাতিলের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
তবে কোনো প্রতিষ্ঠানকে অনিয়মের অভিযোগে কালো তালিকাভুক্ত করার আগে লিখিত কারণ দর্শানোর নোটিশ দিতে হবে এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে।
জাতীয় জরুরি পরিস্থিতি বা উন্নয়ন সহযোগীদের বিশেষ প্রয়োজনের ক্ষেত্রে প্রচলিত ক্রয় পদ্ধতির বাইরে ‘বিকল্প ক্রয় ব্যবস্থা’ নেওয়ার সুযোগও রাখা হয়েছে। নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করে বিশেষ পরিস্থিতিতে অন্য ক্রয় পদ্ধতি ব্যবহার করা যাবে।
বৈদেশিক অর্থায়ন ও উন্নয়ন সহযোগীদের নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্দিষ্ট প্রকল্পের কেনাকাটাতেও এ ব্যবস্থা প্রয়োগ করা যাবে।
সংশোধিত অধ্যাদেশের মাধ্যমে সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় নতুন প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি দরপত্র মূল্যায়নে গুণগত মান, টেকসইতা, পরিবেশগত প্রভাব ও শক্তি দক্ষতাকে গুরুত্ব দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে অনিয়ম ও অসদাচরণের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার বিধানও জোরদার করা হয়েছে।
প্রতিবেদকের নাম 























