ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সম্পর্ক অনেকের জন্যই স্নাতক শেষ হওয়ার সঙ্গে থেমে যায় না। দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা সাবেক শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত রাখা এবং তাদের অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতাকে কাজে লাগানোর লক্ষ্যেই গড়ে উঠেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন (ডুয়া)।
‘অনবদ্য আটাত্তর’ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) সংগঠনটির ৭৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করা হচ্ছে। ১৯৪৯ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠার পর ৭৭ বছর পেরিয়ে আসা ডুয়ার কার্যক্রমও সময়ের সঙ্গে বিস্তৃত হয়েছে। সাবেক শিক্ষার্থীদের যোগাযোগ ও পুনর্মিলনের গণ্ডি পেরিয়ে এখন শিক্ষার্থীদের বৃত্তি, মেন্টরশিপ, পেশাগত নেটওয়ার্ক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে সহযোগিতার মতো বিষয়েও কাজ করছে সংগঠনটি।
ডুয়ার ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সংগঠনটির আজীবন সদস্য ১৭ হাজারের বেশি।
যেভাবে যাত্রা শুরু
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাই সংগঠনের ধারণাটি প্রথম সামনে আনেন ১৯২৫ সালের ব্যাচের শিক্ষার্থী ড. মুমতাজউদ্দিন আহমদ। পরে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের জনশিক্ষা বিভাগের পরিচালক এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করেন। তার উদ্যোগ বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম রেজিস্ট্রার খান বাহাদুর নজিরউদ্দিন আহমদ।
১৯৪৯ সালে সংগঠনটি প্রতিষ্ঠিত হলে বিচারপতি এম. ইব্রাহিম প্রথম সভাপতি এবং মিজানুর রহমান প্রথম মহাসচিব হন। শুরুতে এর নাম ছিল ‘ওল্ড বয়েজ অ্যাসোসিয়েশন’। ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত এ নামেই কার্যক্রম চলে। ১৯৬০ সালে নাম পরিবর্তন করে ‘ওল্ড স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন’ করা হয়। নারী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ যুক্ত হওয়ার পর সংগঠনটি ‘ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন’ নামে পরিচিতি পায়।
অ্যালামনাই ফ্লোর
২০০৪ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত সভাপতি সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী ও মহাসচিব রকিবউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বাধীন কমিটির সময়ে সংগঠনটির সাংগঠনিক কার্যক্রমে বড় পরিবর্তন আসে। এ সময় নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনের নিচতলায় ডুয়ার নিজস্ব অর্থায়নে একটি অফিস কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়।
প্রায় ১৬ হাজার বর্গফুটের স্থাপনাটির কাজ ২০০৭ সালে শেষ হয়। পরে এটি ‘অ্যালামনাই ফ্লোর’ নামে পরিচিতি পায়। সেখানে প্রশাসনিক কার্যালয়ের পাশাপাশি সভা ও সম্মেলন কক্ষ, লাইব্রেরি, কম্পিউটার ল্যাব, কফি হাউস, সামাজিক আড্ডার জায়গা, জিমনেসিয়াম ও নামাজের হল রয়েছে।
অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের পাশে
ডুয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম হলো অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল মেধাবী শিক্ষার্থীদের সহায়তা করা। অ্যালামনাইদের অনুদান, বিভিন্ন ট্রাস্ট ফান্ড ও সহযোগিতামূলক উদ্যোগের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দেওয়া হয়।
সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, বছরে প্রায় ৪০০ শিক্ষার্থীকে বৃত্তি দেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে। বর্তমান ওয়েবসাইটে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ২০০-এর বেশি বৃত্তি দেওয়ার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। বৃত্তির ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর আর্থিক প্রয়োজনের পাশাপাশি মেধা, অধ্যবসায়, নেতৃত্ব ও সামাজিক অবদানও বিবেচনায় নেওয়া হয়।
শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য শতভাগ বৃত্তির ব্যবস্থাও করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ডুয়ার সদস্য সচিব আব্দুল বারী ড্যানী।
তিনি বলেন, শুধু অর্থের অভাবে কোনো শিক্ষার্থীর পড়াশোনা যেন থেমে না যায়, সেটিই তাদের অন্যতম লক্ষ্য।
মেন্টরশিপ ও পেশাগত নেটওয়ার্ক
সময়ের সঙ্গে ডুয়ার কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছে মেন্টরশিপ, ক্যারিয়ার উন্নয়ন, নেতৃত্ববিষয়ক কর্মশালা ও পেশাগত যোগাযোগের সুযোগ। ১৭ হাজারের বেশি আজীবন সদস্যকে বিভিন্ন প্রজন্ম, পেশা ও দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা একটি বড় নেটওয়ার্ক হিসেবে দেখছে সংগঠনটি।
ডুয়ার সদস্য সচিব আব্দুল বারী ড্যানী বলেন, অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন সাবেক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি স্থায়ী সংযোগ তৈরি করে। বিভিন্ন দেশে ও পেশায় ছড়িয়ে পড়া সাবেক শিক্ষার্থীদের আবেগ, ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতাকে একত্রিত করে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কাজে লাগানোই সংগঠনটির অন্যতম উদ্দেশ্য।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নেও সম্পৃক্ততা
শিক্ষার্থী সহায়তার পাশাপাশি গবেষণা, অবকাঠামো ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে সাবেক শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করার উদ্যোগও রয়েছে ডুয়ার।
আব্দুল বারী ড্যানী জানান, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে কোন কোন ক্ষেত্রে সহযোগিতা প্রয়োজন, তা জানার চেষ্টা করা হচ্ছে। এরপর দেশে ও বিদেশে থাকা অ্যালামনাইদের সক্ষমতা ও আগ্রহ অনুযায়ী সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছেন, তারা যেখানেই থাকুন না কেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ও সম্পৃক্ততা বজায় রাখা জরুরি। শিক্ষার্থীদের কল্যাণ, গবেষণা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে সাবেক শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও সহযোগিতা কাজে লাগানোর একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ডুয়াকে আরও শক্তিশালী করতে চান তারা।
‘অনবদ্য আটাত্তর’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সংগঠনটির লক্ষ্যও সেই ধারাবাহিকতাকে আরও বিস্তৃত করা। দীর্ঘ পথচলায় সাবেক শিক্ষার্থীদের যোগাযোগের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষার্থীদের প্রতি দায়বদ্ধতাকে আরও সংগঠিত করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন সংগঠনের নেতারা।
প্রতিবেদকের নাম 



















