দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে নির্মাণকাজ, হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় এবং গাজীপুর-উত্তরা করিডরে মানুষের সীমাহীন ভোগান্তির পর বাতিল করা হয়েছে বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্প। এখন প্রকল্পের অবকাঠামো অপসারণ করে সড়কটি ছয় লেনের মহাসড়কে রূপান্তরের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এতে শুধু স্টেশন ও লেন বিভাজক ভাঙতেই ব্যয় হবে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা।
সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত নির্মিত বিআরটি অবকাঠামো সরিয়ে সড়কটিকে সাধারণ মহাসড়ক হিসেবে ব্যবহারের উপযোগী করা হবে। এ জন্য করিডরে নির্মিত ২৫টি স্টেশন ও লেন বিভাজক অপসারণ করা হবে। পাশাপাশি দুটি দুই লেনের উড়ালপথকে চার লেনের মহাসড়কে রূপান্তরের পরিকল্পনাও রয়েছে।
সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর অবকাঠামো অপসারণে ৪৫ কোটি টাকা এবং সড়ক প্রশস্তকরণে আরও ২৭ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব দিয়েছে। অন্যদিকে, অপসারণ করা স্টেশনগুলোর মালামাল বিক্রি করে প্রায় ৭ কোটি টাকা পাওয়া যেতে পারে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
রোববারের মন্ত্রিসভা বৈঠকে প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে আলোচনা শেষে এটি বাতিল করে সাধারণ মহাসড়ক হিসেবে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে নির্দেশ দেয় সড়ক পরিবহণ ও মহাসড়ক বিভাগ।
১৪ বছরে ব্যয় ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা
২০১২ সালে বিমানবন্দর থেকে গাজীপুরের শিববাড়ী পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ বিআরটি প্রকল্প হাতে নেয় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। এর লক্ষ্য ছিল সড়কের মাঝখানে পৃথক লেনে বিশেষ বাস চালিয়ে দ্রুত ও নির্বিঘ্ন গণপরিবহণ নিশ্চিত করা।
প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ২ হাজার ৪০ কোটি টাকা। ২০১৬ সালের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করে ২০১৭ সাল থেকে বাস চালুর পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হয়নি। একাধিকবার সংশোধনের পর প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রকল্পের অবকাঠামোগত কাজের অগ্রগতি প্রায় ৯৩ শতাংশ হলেও মূল বাসসেবা চালু করা সম্ভব হয়নি। ২০২৫ সালে প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে ৬ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকা এবং মেয়াদ ২০২৯ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে সংশোধিত প্রস্তাব অনুমোদন না করে বিকল্প খোঁজা এবং নকশাগত ত্রুটির জন্য দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
বিশেষ বাস সংগ্রহ করতে না পারাই বড় ব্যর্থতা
বিআরটি প্রকল্পের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল যানজট এড়িয়ে নির্দিষ্ট লেনে বিশেষ বাস চালানো। এতে বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত যাতায়াতের সময় কমবে এবং সড়কের পরিবহণ সক্ষমতা বাড়বে বলে আশা করা হয়েছিল।
কিন্তু দীর্ঘ সময়েও প্রয়োজনীয় বিশেষ বাস সংগ্রহ করা যায়নি। প্রথমে স্বয়ংক্রিয় দরজাযুক্ত বাস চালানোর পরিকল্পনা থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। পরে বৈদ্যুতিক বাস কেনার উদ্যোগও সফল হয়নি। এমনকি ২০২৪ সালের এপ্রিলে ১৩৭টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ডিজেলচালিত বাস কেনার দরপত্র আহ্বান করা হলেও শেষ পর্যন্ত বাস সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।
এ ছাড়া স্টেশন নির্মাণের নকশায়ও অসামঞ্জস্য ছিল। বাংলাদেশের প্রচলিত বাসের দরজা বাম পাশে থাকলেও বিআরটি স্টেশন তৈরি করা হয়েছিল ডান পাশে দরজাবিশিষ্ট বাসের কথা বিবেচনায় রেখে। ফলে বিশেষ বাস চালু হলেও বিদ্যমান গণপরিবহণের সঙ্গে সংযোগ নিয়ে জটিলতা তৈরির আশঙ্কা ছিল।
নির্মাণকাজে দীর্ঘ ভোগান্তি
বিআরটি প্রকল্পের নির্মাণকাজের কারণে বিমানবন্দর, উত্তরা, টঙ্গী, আবদুল্লাহপুর ও গাজীপুর এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে যানজট ও জনদুর্ভোগ বেড়েছে। সড়কের মাঝখানে নির্মাণসামগ্রী, বিভাজক ও অসমাপ্ত অবকাঠামোর কারণে যান চলাচলের জায়গা কমে যায়। এতে কর্মজীবী মানুষ থেকে শুরু করে পণ্যবাহী যানবাহন পর্যন্ত সবাইকে বাড়তি সময় ও পরিবহণ ব্যয় বহন করতে হয়েছে।
ভূমি অধিগ্রহণ, নকশা পরিবর্তন, ভূগর্ভস্থ গ্যাস ও বিদ্যুতের লাইন স্থানান্তর, পানি নিষ্কাশন সমস্যা এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতায় প্রকল্পের কাজ বারবার বাধাগ্রস্ত হয়।
ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক বৃহত্তর ময়মনসিংহ, উত্তরবঙ্গ ও টাঙ্গাইলের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ পথ। গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে কাঁচামাল সরবরাহ এবং তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্য পরিবহণেও সড়কটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
প্রকল্প বাতিল নিয়ে বিশেষজ্ঞদের ভিন্নমত
বিআরটি প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। বুয়েটের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক মুসলেহ উদ্দীন হাসানের মতে, প্রকল্পটি বাতিলের আগে এর আর্থিক ক্ষতি ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন ছিল। তাঁর মতে, প্রকল্পটি চালু করা গেলে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত গণপরিবহণব্যবস্থার সুবিধা বাংলাদেশের মানুষও পেতে পারতেন।
অন্যদিকে, যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক ড. সামছুল হক মনে করেন, গাজীপুর-বিমানবন্দর করিডরে বিআরটি প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তই ছিল ভুল। তাঁর মতে, প্রকল্পের মূল বিআরটি ব্যবস্থার তুলনায় করিডর উন্নয়নের বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণেই অধিকাংশ অর্থ ব্যয় হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, প্রকল্পটি চালু করতে হলে নতুন করে কয়েক হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রয়োজন হতে পারে। এতে করিডরের যানজট ও শিল্পাঞ্চলের কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্বজুড়ে চালু রয়েছে বিআরটি
বিআরটি ব্যবস্থা বাংলাদেশে চালু করা সম্ভব না হলেও বিশ্বের বহু শহরে এটি সফলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। গ্লোবাল বিআরটি ডেটার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ১৯১টি শহরে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এসব শহরে প্রতিদিন প্রায় সোয়া তিন কোটি যাত্রী বিআরটি ব্যবহার করেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারত, চীন ও তাইওয়ানেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক যাত্রী এ ব্যবস্থায় যাতায়াত করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিআরটি প্রকল্পের অভিজ্ঞতা থেকে ভবিষ্যতের বড় অবকাঠামো প্রকল্পে পরিকল্পনা, নকশা, অর্থায়ন, বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ের ক্ষেত্রে শিক্ষা নেওয়া জরুরি।
দীর্ঘদিনের ভোগান্তির পর গাজীপুর-উত্তরা করিডরকে সাধারণ ছয় লেনের মহাসড়কে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রকল্পে ব্যয় হওয়া বিপুল অর্থের কতটা কার্যকর সুফল পাওয়া যাবে, তা নির্ভর করবে নতুন পরিকল্পনার যথাযথ বাস্তবায়নের ওপর।
প্রতিবেদকের নাম 




















