তাবুক—মদিনা ও দামেস্কের মধ্যবর্তী ঐতিহাসিক একটি অঞ্চল। নবম হিজরিতে (৬৩০ খ্রিস্টাব্দ) রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনা থেকে প্রায় ৬৯০ কিলোমিটার দূরের তাবুকের উদ্দেশে যাত্রা করেন। ইসলামের ইতিহাসে এই অভিযান বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
তাবুক অভিযানের দীর্ঘ সফরে রাসুলুল্লাহ (সা.) বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করেন এবং নামাজ আদায় করেন। পরবর্তী সময়ে এসব স্থানের কিছু জায়গায় মসজিদ নির্মিত হয়। ঐতিহাসিক বিভিন্ন গ্রন্থে এমন কয়েকটি মসজিদের বিবরণ পাওয়া যায়।
১. মসজিদুত তাওবা
তাবুকে রাসুলুল্লাহ (সা.) ১৬ দিনেরও বেশি সময় অবস্থান করেছিলেন। এ সময় তিনি বিভিন্ন স্থানে নামাজ আদায় করেন বলে ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। আল-মুতরির ‘তারিখ’ গ্রন্থে ইবনু জুবালার সূত্রে তাবুকের কয়েকটি মসজিদের কথা পাওয়া যায়। এর মধ্যে একটি মসজিদ ‘মসজিদুত তাওবা’ নামে পরিচিত।
আল-মুতরির বর্ণনা অনুযায়ী, উমর ইবনু আবদুল আজিজ (রহ.)-এর শাসনামলে ৯৮ হিজরিতে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। পরবর্তী সময়ে আইয়ুবি ও মামলুক শাসনামলে এর যত্ন নেওয়া হয়। উসমানি শাসকরাও মসজিদটি পুনর্নির্মাণ করেন।
১৩২৫ হিজরিতে তুর্কি শাসনামলে মসজিদটি আবার সংস্কার করা হয়। সে সময় খোদাই করা পাথর ব্যবহার করা হয়েছিল এবং এর ব্যয় বহন করত উসমানি সরকার।
১৩৯৩ হিজরিতে সৌদি বাদশাহ ফয়সাল তাবুক সফরে এসে মসজিদটি পরিদর্শন ও সেখানে নামাজ আদায় করেন। পরে তিনি মসজিদটি ইসলামী স্থাপত্যশৈলীতে পুনর্নির্মাণের নির্দেশ দেন। এক বছরের মধ্যেই সেই কাজ শেষ হয়।
মসজিদটি তাবুকের দুর্গ ও ‘আইন’ নামের ঝরনার উত্তর-পূর্ব দিকে প্রায় ৪০০ মিটার দূরে অবস্থিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ঐতিহাসিক বর্ণনায় বলা হয়, তাবুকে অবস্থানকালে রাসুলুল্লাহ (সা.) এখানে অবস্থান করেছিলেন।
২. মসজিদু সানিয়্যাতি মাদরান
প্রাচীনকালে এই স্থানটি ‘আল-মাদরান’ বা ‘সানিয়্যাতি মাদরান’ নামে পরিচিত ছিল। পরবর্তী সময়ে ‘আল-মাদরাহ’ নামেও এর পরিচিতি পাওয়া যায়।
তাবুক থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দূরে হিররাতুর রাহার পথে এটি অবস্থিত। এ পথের আশপাশে প্রাচীন লিহইয়ানি যুগের প্রত্নস্থল কুসাইরুত তামরাহ রয়েছে। একসময় অঞ্চলটি তাবুক ও আশপাশের প্রাচীন নগরগুলোর পর্যবেক্ষণকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
পথে জাবাল ‘আইরিন’ নামে একটি বড় পাহাড় রয়েছে। এরপর গিরিপথ পেরিয়ে ওয়াদি নাআমের দিকে যেতে হয়। সেখানে কালো ও শক্ত ছোট ছোট পাথরে গঠিত একটি পথ রয়েছে, যেটি দিয়ে মানুষ ও উটের কাফেলা চলাচল করত।
এই পথ শেষে একটি প্রশস্ত সমতল এলাকায় পৌঁছায়। বড় কাফেলা ও সেনাবাহিনীর রাত কাটানোর উপযোগী ওই স্থানে একটি মসজিদ রয়েছে। ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, রাসুলুল্লাহ (সা.) সেখানে নামাজ আদায় করেছিলেন।
৩. মসজিদুজ জারাব
তাবুক থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার দূরে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১ হাজার ৬১৯ মিটার উচ্চতায় মসজিদুজ জারাবের অবস্থান বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঐতিহাসিক বর্ণনায় জানা যায়, তাবুক অভিযানের পথে প্রচণ্ড গরম ও দুর্গম পথের কারণে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাফেলাকে একপর্যায়ে দ্রুত অগ্রসর হতে হয়েছিল। দিনের একটি পর্যায়ে দীর্ঘ সময় অবস্থান না করে পরবর্তী পর্যায়ে যেতে হয়। ফলে আল-আখদারে পৌঁছাতে রাত হয়ে যায়।
জারাব দক্ষিণ দিকে ওয়াদিল ফালাজের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। উপত্যকার পথে ধীরে ধীরে ওপরে উঠতে হয়। এ অঞ্চলের একটি মসজিদকে স্থানীয়রা ‘মসজিদুস সাহাবা’ নামে অভিহিত করতেন বলে ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে।
উপত্যকার শেষ দিকে আরও একটি প্রশস্ত জায়গায় মসজিদের অস্তিত্বের কথা স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে জানা যায়। তারা এটিকে ‘মসজিদুর রাসুল’ (সা.) নামে পরিচয় দিয়ে থাকে।
৪. মসজিদু আইনিল আখদার
আইনুল আখদার নামের একটি ঝরনার কাছাকাছি এই মসজিদের অবস্থান ছিল বলে উল্লেখ পাওয়া যায়। বর্তমানে জায়গাটি ‘আল-বাইদা’ নামে পরিচিত। তবে সময়ের ব্যবধানে মসজিদটির দৃশ্যমান কোনো চিহ্ন আর অবশিষ্ট নেই।
এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরে গোত্রগুলোর পানির উৎস, কাফেলার চলাচলের পথ ও কৃষিজমি হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় পুরোনো স্থাপনার চিহ্ন মুছে গেছে বলে ধারণা করা হয়।
তাবুক অভিযানের চতুর্থ পর্যায় ছিল আল-আখদার। দীর্ঘ ও কষ্টকর সফর শেষে মুসলিম বাহিনী রাতে এখানে পৌঁছায়। সারাদিনের যাত্রায় সবাই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন।
এ সময় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপরও ঘুমের প্রভাব পড়েছিল বলে বর্ণনা পাওয়া যায়। আবু রুহম আল-গিফারি এ ঘটনার বর্ণনাকারী ছিলেন। তিনি আশঙ্কা করেছিলেন, তাঁর বাহন যেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বাহনের খুব কাছে গিয়ে তাঁকে কষ্ট না দেয়। কিন্তু প্রবল ঘুমের কারণে শেষ পর্যন্ত তাঁর আশঙ্কাই সত্যি হয়।
৫. মসজিদু বাআলি বা লাআলা
আল-আখদার বা আইনুল আখদারের দক্ষিণ-পূর্ব দিকের পাহাড় থেকে নেমে আসা একটি উপত্যকা পরে আল-জাও এলাকায় গিয়ে প্রশস্ত নিম্নভূমি তৈরি করেছে। এই অঞ্চলকে কাআ লাআলা বা বাআলি বলা হয়।
তাবুক অভিযানের পর্যায়ক্রমে আল-আখদার ছিল চতুর্থ এবং লাআলা ছিল পঞ্চম পর্যায়।
লাআলার কাছাকাছি ওয়াদি তালাহ নামে একটি উপত্যকা রয়েছে। ঐতিহাসিক বর্ণনায় বলা হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে সেখানে কুজাআ গোত্রের কয়েকটি শাখার বিরুদ্ধে একটি অভিযান পরিচালিত হয়েছিল।
লাআলা উপত্যকার আশপাশের এলাকা ছিল তুলনামূলকভাবে প্রশস্ত ও গাছপালায় সমৃদ্ধ। উটের খাদ্য হিসেবে ব্যবহারের উপযোগী উদ্ভিদ এবং বিভিন্ন বড় গাছ ছিল সেখানে। কয়েকটি কূপ থেকেও পানি সংগ্রহ করা হতো। বর্তমানে সেগুলোর বেশির ভাগই শুকিয়ে গেছে।
বাআলি বা লাআলা, সুমনা, খাতমি ও খুজমা—এলাকাগুলো পরস্পরের কাছাকাছি। বিশাল মুসলিম বাহিনী প্রয়োজন অনুযায়ী এসব কাছাকাছি এলাকায় ভাগ হয়ে রাত কাটিয়ে থাকতে পারে বলে ঐতিহাসিকদের ধারণা।
৬. মসজিদু সুমনা
সুমনা নামটি এখনো প্রচলিত রয়েছে। এটি আইনুল আখদারের দক্ষিণ-পূর্বে আল-জাও এলাকায় অবস্থিত এবং আইনুল আখদার থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে।
ছোট এই উপত্যকাটি আইনুল আখদার ও আল-জাওয়ের মধ্যবর্তী পথে অবস্থিত। এটি হিররাতুর রাহার শেষ প্রান্ত এবং তাবুক থেকে আল-উলা, মাদায়িন সালেহ বা আল-হিজরের দিকে যাওয়া কাফেলাগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ ছিল।
ঐতিহাসিক ভূগোলবিদ ইয়াকুত আল-হামাভি সুমনাকে মদিনা ও শামের মধ্যবর্তী একটি স্থান হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তাবুক অভিযানের সময় বিশাল সেনাবাহিনীর সদস্যরা সুমনা, খুজমা ও লাআলার মতো কাছাকাছি উপত্যকাগুলোতে ভাগ হয়ে রাত কাটিয়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হয়।
৭. মসজিদু শাক তারা
আল-মুশাক্কাক, যা বর্তমানে আশ-শাক নামে পরিচিত, তাবুক অভিযানের ষষ্ঠ পর্যায়ের একটি স্থান হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। খাতমি, খুজমি, লাআলা ও সুমনা অতিক্রম করার পর এই অঞ্চলটি পড়ে।
এসব স্থান থেকে আশ-শাকের দূরত্ব খুব বেশি নয়—প্রায় ২০ কিলোমিটারের মধ্যে। বর্তমানে এ অঞ্চলে বালি গোত্রের বিভিন্ন শাখার মানুষ বসবাস করে।
আশ-শাকের ভূপ্রকৃতি কিছুটা ব্যতিক্রমী। এটি কোনো পাহাড় থেকে নেমে আসা উপত্যকা নয়; বরং মাটির মাঝখানে দীর্ঘ ফাটলের মতো দেখতে। এর নিচে শক্ত পাথর রয়েছে, যা অনেকটা সাজানো পাথরের মেঝের মতো মনে হয়।
এ অঞ্চল একটি জলাধার বা ছোট জলকুণ্ডের কাছাকাছি। উপত্যকাটি সংকীর্ণ হলেও আবু রাকাহ উপত্যকার পানিপ্রবাহের সঙ্গে এর যোগাযোগ রয়েছে। ফলে গ্রীষ্মকালেও এখানে কিছু পানি থাকার কথা ঐতিহাসিক বর্ণনায় পাওয়া যায়।
এই পথ আল-হিজর, আল-উলা ও মদিনা মুনাওয়ারার দিকে চলে গেছে। কাছেই জানাবু কাওয়াকিব—বর্তমানে যা আয-যুনাইব নামে পরিচিত। এর দক্ষিণে রয়েছে আল-জাও এলাকা।
তাবুক অভিযান ইসলামের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সেই অভিযানের দীর্ঘ যাত্রাপথে রাসুলুল্লাহ (সা.) যেসব স্থানে অবস্থান ও নামাজ আদায় করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে, সেসব স্থান আজও তাবুক অঞ্চলের ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
প্রতিবেদকের নাম 




















