সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে নৈতিক স্খলনের অভিযোগে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। গত ২২ জুলাই বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরদিন বিষয়টি জানিয়ে স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনে চিঠি দেয় দলটি।
তবে শুধু দল থেকে বহিষ্কার করলেই তার সংসদ সদস্য পদ শূন্য হবে কি না, তা নিয়ে সাংবিধানিক প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে আইনজীবীদের মধ্যেও ভিন্নমত রয়েছে।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে কী আছে
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত সংসদ সদস্য দল থেকে পদত্যাগ করলে অথবা সংসদে ওই দলের বিপক্ষে ভোট দিলে তার আসন শূন্য হবে।
তবে দল থেকে বহিষ্কার হওয়ার বিষয়টি ওই অনুচ্ছেদে সরাসরি উল্লেখ নেই। ফলে শুধু বহিষ্কারের কারণে গাজী নজরুলের সংসদ সদস্য পদ শূন্য হবে কি না, তা নিয়ে আইনগত ব্যাখ্যার ভিন্নতা দেখা দিয়েছে।
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকনের মতে, সংবিধান ও আইন অনুযায়ী গাজী নজরুল সংসদ সদস্য পদে থাকতে পারবেন না। তার ভাষ্য, নৈতিক স্খলনের কারণে দল তাকে বহিষ্কার করায় সংবিধানের ৬৬(৪) অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য হবে এবং এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে।
এ প্রসঙ্গে তিনি ১৯৯৬ সালের সংসদের বিএনপির তৎকালীন সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের উদাহরণ দেন। তার দাবি, ফ্লোর ক্রসিংয়ের কারণে আখতারুজ্জামানকে বহিষ্কার করা হয়েছিল এবং পরে আদালতে গিয়ে তিনি মামলায় হেরে সংসদ সদস্য পদ হারান।
ভিন্ন ব্যাখ্যা আইনজীবী ইশরাত হাসানের
তবে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান ভিন্ন মত দিয়েছেন। তার মতে, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে দল থেকে বহিষ্কারকে সংসদ সদস্য পদ শূন্য হওয়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি।
তিনি বলেন, শুধু নৈতিক স্খলনের অভিযোগে দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার কারণে কোনো সংসদ সদস্যের পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে—এমনটি সংবিধানের ভাষা থেকে বলা যায় না। তবে বহিষ্কারের পর ওই সংসদ সদস্য ৭০ অনুচ্ছেদে বর্ণিত অন্য কোনো পরিস্থিতিতে পড়লে বিষয়টি ভিন্নভাবে বিবেচিত হতে পারে।
তার মতে, সদস্য পদ শূন্য হওয়ার প্রশ্ন সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে এবং প্রয়োজন হলে বিষয়টি আদালতের বিচারিক পর্যালোচনার আওতায় আসতে পারে।
নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন
সংবিধানের ৬৬(৪) অনুযায়ী, কোনো সংসদ সদস্য ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে আসন হারিয়েছেন কি না, তা নিয়ে বিরোধ হলে নির্বাচন কমিশন বিষয়টি নিষ্পত্তি করবে।
তবে অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসানের মতে, এ ক্ষেত্রে ইসির সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেন, আবার আপত্তি থাকলে হাইকোর্টে রিট করতে পারেন। সেখানেও সমাধান না হলে আপিল বিভাগে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
ইসির অবস্থান কী
গাজী নজরুলের বহিষ্কারের পর গত ২৩ জুলাই নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানিয়েছিলেন, শুধু দল থেকে বহিষ্কারের চিঠির ভিত্তিতে ইসির কিছু করার সুযোগ নেই। স্পিকার বা সংসদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক রেফারেন্স এলে বিষয়টি পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
পরে ২১ সেপ্টেম্বর ইসি সচিব আখতার আহমেদও জানান, গাজী নজরুলের বিষয়ে স্পিকারের কাছ থেকে ইসি কোনো চিঠি পায়নি। সংসদ সচিবালয় থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি জানানো হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
মামলা ঘিরেও আলোচনায় এমপি পদ
গাজী নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের লাশ গত ২০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় করা আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
দুই দফায় মোট আট দিনের রিমান্ড শেষে সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) আদালত তার জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
মরিয়মের মৃত্যুর ঘটনা এবং গাজী নজরুলের দল থেকে বহিষ্কারের পর তার সংসদ সদস্য পদ নিয়ে আলোচনা নতুন করে শুরু হয়। এখন মূল প্রশ্ন হলো, দলীয় বহিষ্কারকে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের আওতায় কীভাবে দেখা হবে এবং স্পিকার বিষয়টি নির্বাচন কমিশনে পাঠাবেন কি না। আনুষ্ঠানিক সাংবিধানিক প্রক্রিয়া ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের পরই এ বিষয়ে পরবর্তী অবস্থান স্পষ্ট হবে।
প্রতিবেদকের নাম 




















