ভূমধ্যসাগরে বিপদে পড়া ১০১ অভিবাসীকে দুটি পৃথক অভিযানে উদ্ধার করেছে বেসরকারি মানবিক সহায়তা সংস্থা এসওএস মেদিতেরানের উদ্ধারকারী জাহাজ ওশান ভাইকিং। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে কয়েকজন শিশু, ৫ জন অন্তঃসত্ত্বা নারী এবং ১৬ জন অভিভাবকহীন অপ্রাপ্তবয়স্ক রয়েছে। উদ্ধার করা অনেকের শরীরে জ্বালানির কারণে পোড়ার ক্ষত পাওয়া গেছে।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) রাত থেকে বুধবার (৭ অক্টোবর) ভোর পর্যন্ত মধ্য ভূমধ্যসাগরে দুটি পৃথক অভিযান চালিয়ে তাদের উদ্ধার করা হয়।
সংস্থাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানায়, প্রথম অভিযানটি লিবিয়ার অনুসন্ধান ও উদ্ধার এলাকায় পরিচালিত হয়। সক্রিয় অভিবাসনবিষয়ক এনজিও অ্যালার্ম ফোনের সতর্কবার্তার পর অভিযান শুরু হয়। এ সময় ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমান্তরক্ষী সংস্থা ফ্রন্টেক্সের একটি বিমান থেকেও সতর্কবার্তা দেওয়া হয়।
প্রথম নৌকাটিতে ছিলেন ৬০ জন। তাদের মধ্যে ২৭ জন পুরুষ, ২১ জন নারী ও ১২ জন শিশু। পাঁচ নারী ছিলেন অন্তঃসত্ত্বা। শিশুদের মধ্যে চারজনের বয়স ১ থেকে ৪ বছরের মধ্যে। উদ্ধারকারীদের তথ্য অনুযায়ী, এসব অভিবাসী দুই দিন ধরে সমুদ্রে ছিলেন। তাদের কাছে কোনো খাবার বা পানীয় জল ছিল না।
জ্বালানির কারণে শরীরে পোড়ার ক্ষত
এসওএস মেদিতেরান জানিয়েছে, উদ্ধার হওয়া অনেকের শরীরে জ্বালানির কারণে পোড়ার ক্ষত রয়েছে। সমুদ্রের পানির সঙ্গে পেট্রল মিশে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটলে এ ধরনের গুরুতর ক্ষত তৈরি হতে পারে। সাধারণত নৌকার মেঝেতে, জ্বালানির কাছাকাছি অবস্থান করা ব্যক্তিরা এ ধরনের আঘাতের ঝুঁকিতে থাকেন।
উদ্ধার হওয়া অন্তঃসত্ত্বা নারীদের একজনকে চিকিৎসার প্রয়োজনে ইতালির কোস্টগার্ডের একটি টহল নৌযানে করে ল্যাম্পেদুসা দ্বীপে নেওয়া হয়েছে। এ সময় তাঁর স্বামীও সঙ্গে ছিলেন।
দ্বিতীয় অভিযানটি বুধবার ভোরে মাল্টার অনুসন্ধান ও উদ্ধার এলাকায় পরিচালিত হয়। অ্যালার্ম ফোনের সতর্কবার্তায় জানানো হয়েছিল, আংশিকভাবে বাতাস বের হয়ে যাওয়া একটি নৌকা বিপদে পড়েছে। ওই নৌকায় ছিলেন ৪১ জন—১৮ জন পুরুষ, ৭ জন নারী এবং ১৬ জন অভিভাবকহীন অপ্রাপ্তবয়স্ক। তারাও দুই দিন ধরে সমুদ্রে ছিলেন এবং তাদের কাছেও খাবার ও পানীয় জল ছিল না।
নেপলস বন্দরে নেওয়ার নির্দেশ
উদ্ধার হওয়া অভিবাসীদের তীরে নামিয়ে দিতে ওশান ভাইকিংকে ইতালির নেপলস বন্দরের দিকে যেতে হবে। এসওএস মেদিতেরানের মতে, দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে নির্ধারিত বন্দরে যেতে হওয়ায় উদ্ধার করা ব্যক্তিদের শারীরিক অবস্থা আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।
এই পরিস্থিতির পেছনে ইতালির ২০২২ সালে চালু হওয়া পিয়ান্তেদোসি ডিক্রির প্রভাব রয়েছে বলে মনে করছেন মানবিক সহায়তাকারীরা। ওই ব্যবস্থার আওতায় উদ্ধারকারী জাহাজকে একটি অভিযান শেষ করার পর সরকার নির্ধারিত বন্দরে যেতে হয়। বিশেষ অনুমতি না পেলে পথে অন্য কোনো বিপদগ্রস্ত নৌকা দেখতে পেলেও নতুন করে উদ্ধার অভিযান চালানো কঠিন হয়ে পড়ে।
মানবিক সহায়তাকারীদের অভিযোগ, এর ফলে উদ্ধারকারী জাহাজগুলোকে অনুসন্ধান ও উদ্ধার এলাকা থেকে দূরের বন্দরে যেতে হচ্ছে। এতে সমুদ্রে যাত্রার সময় বাড়ছে এবং জাহাজগুলো দীর্ঘ সময়ের জন্য মধ্য ভূমধ্যসাগরের উদ্ধার এলাকা থেকে দূরে থাকছে।
মধ্য ভূমধ্যসাগর ইউরোপে প্রবেশের অন্যতম প্রধান অভিবাসনপথ। প্রতিবছর লিবিয়া, তিউনিসিয়া ও উত্তর আফ্রিকার অন্যান্য দেশ থেকে হাজারো মানুষ ছোট ও ঝুঁকিপূর্ণ নৌকায় ইউরোপের উদ্দেশে যাত্রা করেন। এসব নৌকার অনেকগুলো সমুদ্রযাত্রার উপযোগী নয় এবং অতিরিক্ত যাত্রী বহন করে।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ইউরোপের উপকূলে পৌঁছানোর চেষ্টা করতে গিয়ে ভূমধ্যসাগরে ১ হাজার ৬৪৭ জন অভিবাসী মারা গেছেন অথবা নিখোঁজ হয়েছেন। ২০২৫ সালের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৩৫ জন।
প্রতিবেদকের নাম 
























