দেশে নিট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) বাড়লেও নতুন মূলধন বিনিয়োগে গতি নেই। চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে নিট এফডিআইয়ের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। তবে এই বিনিয়োগের প্রায় ৭৫ শতাংশই এসেছে আগে থেকে বাংলাদেশে ব্যবসা করা বিদেশি কোম্পানিগুলোর মুনাফা পুনর্বিনিয়োগ থেকে। বিপরীতে, নতুন ইকুইটি বিনিয়োগ কমেছে ৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যানের বরাত দিয়ে এসব তথ্য জানিয়েছে ইনভেস্ট বাংলাদেশ।
নিট এফডিআইয়ের বড় অংশ পুনর্বিনিয়োগ থেকে
ইনভেস্ট বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে দেশে নিট এফডিআই এসেছে ৩৪ কোটি ৬৯ লাখ ৪০ হাজার ডলার। এর মধ্যে ২৬ কোটি ৯ লাখ ১০ হাজার ডলার এসেছে আগে থেকে বিনিয়োগ করা বিদেশি কোম্পানিগুলোর মুনাফা পুনর্বিনিয়োগের মাধ্যমে।
অর্থাৎ, মোট নিট এফডিআইয়ের প্রায় ৭৫ শতাংশই এসেছে বিদ্যমান বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে। ফলে সামগ্রিক এফডিআই বাড়লেও নতুন বিদেশি মূলধন আকর্ষণের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।
বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ সাধারণত তিনটি উপায়ে আসে—নিট পুনর্বিনিয়োগকৃত আয়, নিট ইকুইটি মূলধন বা নতুন বিনিয়োগ এবং নিট আন্তঃকোম্পানি ঋণ।
নতুন মূলধন ও আন্তঃকোম্পানি ঋণে পতন
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে নিট ইকুইটি বিনিয়োগ হয়েছে ৭ কোটি ৭৪ লাখ ২০ হাজার ডলার। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এই বিনিয়োগ কমেছে ৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ।
একই সময়ে বিদেশি কোম্পানিগুলোর আন্তঃকোম্পানি ঋণের নিট প্রবাহ কমেছে ৮৫ দশমিক ১৭ শতাংশ। এ খাতে নিট প্রবাহ দাঁড়িয়েছে ৮৬ লাখ ১০ হাজার ডলারে। মোট ঋণপ্রবাহ ৩৩ কোটি ৩৮ লাখ ডলার হলেও আগের ঋণ পরিশোধের কারণে নিট প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
নতুন বিনিয়োগে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার প্রভাব
ইনভেস্ট বাংলাদেশ বলছে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও জ্বালানির উচ্চমূল্য নতুন বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে চাপ তৈরি করছে। এসব কারণে বিশ্বজুড়েই বিনিয়োগকারীরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন, যার প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশেও।
ইনভেস্ট বাংলাদেশের বিনিয়োগ উন্নয়ন উইংয়ের সদস্য নাহিয়ান রহমান রচি বলেন, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ও জ্বালানির উচ্চমূল্যের মধ্যেও বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক। তবে বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থানের কারণে নতুন ইকুইটি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা এখনো চ্যালেঞ্জিং।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে আগে থেকে বিনিয়োগ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্বিনিয়োগ করা আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এটি দেশের ব্যবসার দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা সম্পর্কে বিদ্যমান বিনিয়োগকারীদের আস্থার ইঙ্গিত দেয়। পুনর্বিনিয়োগ ব্যবসা সম্প্রসারণ, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
বিনিয়োগ পাইপলাইনে ১.৩ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প
নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণে বিনিয়োগ পরিবেশের মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধানের ওপর জোর দিচ্ছে ইনভেস্ট বাংলাদেশ। নাহিয়ান রহমান রচি জানান, সংস্থাটির বিনিয়োগ পাইপলাইনে থাকা ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্পগুলোকে বাস্তব বিনিয়োগ ও বাস্তবায়নের পর্যায়ে নিতে কাজ চলছে। সম্প্রতি কয়েকটি বড় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ ঘোষণাকেও তিনি আশাব্যঞ্জক বলে উল্লেখ করেন।
অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ কমেছে ২৫ শতাংশের বেশি
অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে বিদেশি বিনিয়োগের চিত্রও উদ্বেগজনক। চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে এসব অঞ্চলে নিট এফডিআই এসেছে ৪ দশমিক ৫১ মিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৫ দশমিক ৩৩ শতাংশ কম। তবে আগের প্রান্তিকে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল মাত্র ০ দশমিক ৪২ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, আগের প্রান্তিকের তুলনায় বিনিয়োগ বাড়লেও বছরওয়ারি হিসাবে তা কমেছে।
অন্যদিকে, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল বা ইপিজেডের বাইরের খাতে নিট এফডিআই ২০ দশমিক ৭৫ শতাংশ বেড়ে ২৮০ দশমিক ৮৮ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এতে অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ কমলেও অন্যান্য খাতে বিদেশি মূলধন প্রবাহ বাড়ার চিত্র দেখা গেছে।
চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নে অগ্রগতি
অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোকে বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুত করাও ইনভেস্ট বাংলাদেশের অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে। নাহিয়ান রহমান রচি জানান, এক দশকের বেশি সময় ধরে বিলম্বিত চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চলের উন্নয়নকাজ এখন এগোচ্ছে। ২০২৮ সালের মধ্যে প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। এ অঞ্চলকে কেন্দ্র করে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য বিনিয়োগ রয়েছে।
তিনি আরও জানান, ইনভেস্ট বাংলাদেশের প্রকাশিত ১৮০ দিনের অগ্রগতি প্রতিবেদনে এ পর্যন্ত অর্জন ও বাকি কাজের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। বিনিয়োগকারীদের আগ্রহকে বাস্তব বিনিয়োগ, চালু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মসংস্থানে রূপান্তর করতে সংস্থাটির কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
প্রতিবেদকের নাম 



















