দেশে কর্মক্ষম মানুষের অনুপাত এখনো তুলনামূলক বেশি। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত করতে পারলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা সম্ভব। কিন্তু ধীরগতিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শ্রমবাজারে নারীদের কম অংশগ্রহণ এবং দক্ষতার ঘাটতির কারণে জনমিতিক সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছে না বাংলাদেশ। একই সময়ে দ্রুত বাড়ছে প্রবীণ জনগোষ্ঠী।
বিশ্বব্যাংকের ‘ডেমোগ্রাফিক চেঞ্জ ইন সাউথ এশিয়া: ফ্রম টেইলউইন্ডস টু হেডউইন্ডস ফর ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৪৫ সালে বাংলাদেশে কর্মক্ষম মানুষের অনুপাত সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে। এরপর ২০৫১ সালে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের হার বেড়ে ১৪ শতাংশে দাঁড়াবে। অর্থাৎ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যাগত সুবিধা কাজে লাগানোর জন্য বাংলাদেশের হাতে এখনো প্রায় দুই দশক সময় রয়েছে।
মঙ্গলবার রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়েছে, জনসংখ্যাগত সুবিধা কাজে লাগাতে কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারীর অংশগ্রহণ এবং প্রবীণদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত ৮৪ শতাংশ শ্রমশক্তি
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৮৪ শতাংশ, অর্থাৎ আনুমানিক ৫ কোটি ৮০ লাখ মানুষ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। এমনকি স্নাতক বা তার চেয়ে বেশি শিক্ষিত ব্যক্তিদের ৬০ শতাংশের বেশি আনুষ্ঠানিক চাকরি না পেয়ে অনানুষ্ঠানিক কাজে যোগ দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এসব কাজে তাঁদের আয় আনুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের তুলনায় ৪৫ থেকে ৮৪ শতাংশ কম।
একদিকে আনুষ্ঠানিক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরগতিতে কর্মসংস্থান তৈরি করছে, অন্যদিকে ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোতে সাম্প্রতিক সময়ে গড়ে শ্রমিকসংখ্যা কমেছে। উচ্চশিক্ষাও আনুষ্ঠানিক খাতে চাকরির নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। এর সঙ্গে শ্রমবাজারে নারীদের কম অংশগ্রহণ এবং শিক্ষা ও দক্ষতার ঘাটতি কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সম্ভাবনা কাজে লাগানোর পথ আরও কঠিন করে তুলছে।
বিশ্বব্যাংকের মতে, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে জরুরি সংস্কার প্রয়োজন। বিশেষ করে তরুণদের শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ করে তোলা এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভালো মানের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়তা করতে হবে।
নারীর অংশগ্রহণ বাড়লে জিডিপি বাড়তে পারে
বাংলাদেশের জনসংখ্যাগত সুবিধা কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ বাড়ানোকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির হিসাবে, দক্ষিণ এশিয়ায় নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার মাত্র ৩৫ শতাংশ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানবসম্পদ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণে মাঝারি মাত্রার উন্নতি করা গেলে ২০৫০ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু প্রকৃত জিডিপি বর্তমান প্রবণতার তুলনায় ৪ শতাংশ বেশি হতে পারে। আর নারী-পুরুষের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের ব্যবধান কমিয়ে আনার মতো উচ্চাভিলাষী সংস্কার বাস্তবায়ন করা গেলে এই বৃদ্ধি ১৩ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
গ্রামে স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি
প্রতিবেদনে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার আঞ্চলিক বৈষম্যের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ গ্রামে বাস করলেও স্বাস্থ্যকর্মীদের মাত্র ২০ শতাংশ গ্রামে কর্মরত। বিপরীতে শহরে চিকিৎসকের ঘনত্ব গ্রামের তুলনায় ১৮ গুণ বেশি।
প্রবীণদের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৬০ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে ৮ শতাংশ ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত। আর ৫০ বছরের বেশি বয়সীদের ৪৮ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগার কথা জানিয়েছেন।
বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছে, কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত করতে ব্যর্থ হলে একদিকে বেকারত্ব ও অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান বাড়বে, অন্যদিকে প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবা, পেনশন ও সামাজিক সুরক্ষায় ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। ফলে কম আয়ের অবস্থায় থেকেই বাংলাদেশকে বার্ধক্যজনিত অর্থনৈতিক চাপ সামলাতে হতে পারে।
সরকারের পরিকল্পনা ও করণীয়
প্রতিবেদন প্রকাশের পর আয়োজিত প্যানেল আলোচনায় এসব চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায় নিয়ে কথা বলেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান, সিপিডির নির্বাহী পরিচালক নাজনীন আহমেদ এবং বিশ্বব্যাংকের রিজিয়নাল প্র্যাকটিস ডিরেক্টর জেম মেতে। আলোচনা সঞ্চালনা করেন বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের ডিভিশন ডিরেক্টর জ্যঁ পেসমে।
সমাজকল্যাণমন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে জনমিতিক সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও আগামী কয়েক বছরে তা প্রতিকূলে চলে যেতে পারে। এ পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার পুরো জীবনচক্রভিত্তিক পদক্ষেপের ওপর জোর দিচ্ছে।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বলেন, তরুণদের স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক—উভয় চাকরির বাজারের জন্য প্রস্তুত করতে হবে। তা না হলে জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগানো সম্ভব হবে না। তিনি জানান, সরকার ২০২৮ সালের মধ্যে ৫০ লাখ এবং ২০৩০ সালের মধ্যে দেড় কোটি মানুষকে সর্বজনীন পেনশন কার্যক্রমের আওতায় আনার লক্ষ্য নিয়েছে।
এর আগে প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ-ভুটান অঞ্চলের বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেসমে বলেন, বাংলাদেশের জনমিতিক সুযোগ নির্ভর করছে এখন দেশটি কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে তার ওপর। ভালো মানের কর্মসংস্থান তৈরিতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা, তরুণদের বাজার উপযোগী দক্ষতায় রূপান্তর এবং নারীদের কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের বাধা দূর করার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জুট বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অর্থনীতি উন্নত হওয়ার তুলনায় দ্রুত এবং আগেই বার্ধক্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
প্রতিবেদনের মূল বার্তা হলো, কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যাগত সুবিধা চিরস্থায়ী নয়। তাই আগামী দুই দশকের মধ্যে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন, নারীর অংশগ্রহণ, স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রবীণদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে না পারলে এই সম্ভাবনা ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক চাপে পরিণত হতে পারে।
প্রতিবেদকের নাম 




















