দেশে চলমান গ্যাস সংকটের প্রভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গিয়ে লোডশেডিং বেড়েছে। মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনাল বন্ধ থাকায় গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে কয়লা ও তরল জ্বালানির সরবরাহ সমস্যা এবং কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারিগরি ত্রুটি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
শনিবার রাত ১টার দিকে দেশের বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ১৫৪ মেগাওয়াট, বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ১৩ হাজার ২৩৮ মেগাওয়াট। ফলে একসময় বিদ্যুতের ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় ২ হাজার ৯১৬ মেগাওয়াট।
এলএনজি টার্মিনাল বন্ধে তীব্র গ্যাস সংকট
গত ২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীতে পেট্রোবাংলার মালিকানাধীন এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড ও কারিগরি ত্রুটির পর থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। টার্মিনালটি পরিচালনা করছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, টার্মিনালের অক্ষত অংশ চলতি সপ্তাহেই চালুর চেষ্টা চলছে। এটি চালু হলে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হতে পারে। তবে পুরো টার্মিনাল সচল হতে আগামী সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
দৈনিক গ্যাস সরবরাহ কমেছে
স্বাভাবিক সময়ে দেশে প্রতিদিন প্রায় ২৬০ থেকে ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলেও বর্তমানে তা নেমে এসেছে ২১০ থেকে ২১৫ কোটি ঘনফুটে। অথচ দেশের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪১০ কোটি ঘনফুট।
দেশের মোট গ্যাস সরবরাহের প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ আসে আমদানি করা এলএনজি থেকে। ফলে সংকটের কারণে আবাসিক, শিল্প, বিদ্যুৎ ও সিএনজি—সব খাতেই সরবরাহ কমানো হয়েছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধাক্কা
গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। সাধারণত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে প্রতিদিন প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলেও তা কমে প্রায় ৬৭ কোটি ৩০ লাখ ঘনফুটে নেমে এসেছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) জানিয়েছে, শুধু গ্যাসের অভাবেই প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে। পাশাপাশি কয়লাভিত্তিক ও ফার্নেস অয়েলচালিত কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রেও জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে।
ঢাকার বাইরে বেশি লোডশেডিং
উৎপাদন ঘাটতি সামাল দিতে রাজধানীর তুলনায় জেলা ও গ্রামাঞ্চলে বেশি লোডশেডিং করা হচ্ছে। অনেক এলাকায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় জনভোগান্তি বেড়েছে।
গ্যাস না থাকায় অনেক পরিবার রান্নার জন্য বৈদ্যুতিক চুলা, রাইস কুকারসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্র ব্যবহার করছে। এতে বিদ্যুতের চাহিদাও বেড়ে যাচ্ছে।
শিল্প, সিএনজি ও আবাসিকে দুর্ভোগ
গ্যাস সংকটে নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও ভালুকাসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অনেক কারখানা অর্ধেক সক্ষমতায় উৎপাদন চালাচ্ছে, আবার কিছু কারখানা সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। বিকল্প হিসেবে ডিজেল ব্যবহার করায় উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে।
অন্যদিকে রাজধানীর রামপুরা, মিরপুর, উত্তরা, মগবাজার, মোহাম্মদপুর ও আদাবরসহ বিভিন্ন এলাকায় কয়েক দিন ধরে রান্নার গ্যাসের তীব্র সংকট চলছে। অনেক এলাকায় গভীর রাতেও পর্যাপ্ত গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না।
সিএনজি স্টেশনগুলোতেও প্রয়োজনীয় চাপ না থাকায় দীর্ঘ যানজট ও অপেক্ষার সৃষ্টি হয়েছে। অনেক ব্যক্তিগত গাড়িচালক সিএনজি না পাওয়ায় গাড়ি ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছেন।
কবে স্বাভাবিক হবে পরিস্থিতি?
পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, বিদেশ থেকে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ এনে মেরামতকাজ চলছে। বিদেশি বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি দেশীয় প্রকৌশলীরাও কাজ করছেন।
টার্মিনালের অক্ষত অংশ চালু হলে জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ সম্ভব হবে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি, শিল্পে গ্যাস সরবরাহ এবং আবাসিক গ্রাহকদের সংকট কিছুটা কমতে পারে। তবে পুরো পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আগামী সপ্তাহ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে।
প্রতিবেদকের নাম 




















