বর্ষার শুরুতেই চলনবিল অধ্যুষিত নাটোরের সিংড়া উপজেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যার পানি প্রবেশ করতে শুরু করেছে। দিন দিন পানি বাড়তে থাকায় নৌকার চাহিদা বেড়েছে। ফলে নতুন নৌকা তৈরির পাশাপাশি পুরনো নৌকা মেরামতের কাজেও ব্যস্ত সময় পার করছেন স্থানীয় কারিগররা।
চলনবিল ও আত্রাই নদীঘেঁষা এ অঞ্চলে বর্ষাকাল এলেই মাছ শিকার, কৃষিকাজ এবং এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যাতায়াতের জন্য নৌকাই হয়ে ওঠে প্রধান ভরসা। আষাঢ় থেকে কার্তিক—প্রায় পাঁচ মাস বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে থাকায় নৌকার প্রয়োজনীয়তা কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
বাড়ছে নৌকার চাহিদা
সরেজমিনে বিলদহর, কালিনগর, শেরকোল, তাজপুর, সাঁতপুকুরিয়া, বড়িয়া, ডাহিয়া, বিয়াশ ও পৌর এলাকার বিভিন্ন কারখানা ঘুরে দেখা গেছে, কারিগররা দিনরাত নতুন নৌকা তৈরি করছেন। একই সঙ্গে অনেকেই পুরনো নৌকায় আলকাতরা লাগানো, জোড়াতালি দেওয়া এবং লোহার পাত ও তারকাঁটা দিয়ে মেরামতের কাজ করছেন।
জেলেরা ইতোমধ্যে মাছ ধরার প্রস্তুতি শুরু করায় নৌকার অর্ডারও বেড়েছে বলে জানিয়েছেন কারিগররা।
উৎপাদন খরচ বেড়েছে
পৌর শহরের বালুয়া বাসুয়া এলাকার এক কাঠমিস্ত্রি জানান, সারা বছর কাঠের বিভিন্ন কাজ করলেও বর্ষা মৌসুমে নৌকা তৈরি ও মেরামতেই বেশি সময় দিতে হয়। এতে অতিরিক্ত আয় হয়, যা সংসারের জন্য সহায়ক।
চকসিংড়া এলাকার নৌকা কারখানার মালিক আব্দুল হান্নান বলেন, তাঁর কারখানায় মূলত কড়ই, হিজল ও মেহগনি কাঠ দিয়ে নৌকা তৈরি করা হয়। পাশাপাশি আলকাতরা, বাঁশ ও তারকাঁটাসহ বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করা হয়।
তিনি জানান, এ মৌসুমে এখন পর্যন্ত প্রায় ৬০টি নতুন নৌকা বিক্রি হয়েছে। মৌসুম শেষে ২০০ থেকে ২৫০টি নৌকা বিক্রির আশা করছেন। বর্তমানে ছোট ডিঙি নৌকার দাম ৫ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার টাকা, আর প্লেন সিটের নৌকা বিক্রি হচ্ছে ৮ হাজার ৫০০ থেকে ৯ হাজার টাকা দরে।
কারিগরদের ব্যস্ততা
নৌকা তৈরির কারিগর স্বপন চন্দ্র সূত্রধর বলেন, বর্ষাকালে প্রতিদিন দুই থেকে তিনটি নৌকা তৈরি করেন। নৌকার ধরন অনুযায়ী প্রতিটির জন্য ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা মজুরি পান। বছরের অন্য সময় কাঠমিস্ত্রির কাজ করেই জীবিকা নির্বাহ করেন।
আরেক কারিগর আব্দুল কুদ্দুস বলেন,
“সারা বছর তেমন কাজ না থাকলেও বর্ষা এলেই আমাদের ব্যস্ততা শুরু হয়। প্রতিদিনই নতুন অর্ডার আসছে। কাঠের দাম বেড়েছে, তবুও প্রয়োজনের কারণে মানুষ নৌকা বানাচ্ছেন।”
ক্রেতাদের কথা
সাঁতপুকুরিয়া গ্রামের মো. রুবেল হোসেন বলেন, তাঁদের গ্রাম চলনবিলের মাঝখানে হওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তাঘাট তলিয়ে যায়। বর্ষাকালে চলাচলের একমাত্র ভরসা নৌকা। তবে এ বছর নৌকার দাম আগের তুলনায় অনেক বেশি।
চামারী ইউনিয়নের আনন্দনগর এলাকার আফজাল হোসেন বলেন, পানি বাড়লেই মাছ ধরা, জমিতে যাওয়া কিংবা এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে যেতে নৌকা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। তাই প্রয়োজনের তাগিদেই নতুন নৌকা কিনতে এসেছেন।
ব্যয় বেড়েছে, তবু চাহিদা অটুট
নৌকা কারখানার মালিক গোদা কুমার জানান, কাঠ, লোহা ও অন্যান্য কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় গত বছরের তুলনায় উৎপাদন খরচ অনেক বেড়েছে। তবুও বর্ষা মৌসুমে নৌকার চাহিদা কমেনি। বরং পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অর্ডারও বাড়ছে।
বর্ষার পানি চলনবিলে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে তাই আবারও প্রাণ ফিরে পেয়েছে ঐতিহ্যবাহী নৌকা শিল্প। স্থানীয় কারিগরদের ব্যস্ততা যেমন বেড়েছে, তেমনি জলাবদ্ধ অঞ্চলের মানুষের জন্য নৌকা আবারও হয়ে উঠছে জীবনযাত্রার অপরিহার্য বাহন।
প্রতিবেদকের নাম 




















