বিয়ে মানুষের জীবনের একটি পবিত্র ও সামাজিক বন্ধন। ইসলামে বিবাহকে শুধু আবেগ বা প্রয়োজনের বিষয় হিসেবে দেখা হয়নি; বরং এটিকে স্থায়ী দায়িত্ব ও গুরুত্বপূর্ণ একটি চুক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তবে নাগরিকত্ব, ভিসা বা অন্য কোনো সুবিধা পাওয়ার উদ্দেশ্যে সাম্প্রতিক সময়ে ‘চুক্তিভিত্তিক বিয়ে’ বা কাগজ-কলমের বিয়ের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ইসলামি শরিয়তে এ ধরনের বিয়ের বৈধতা নিয়ে অনেকের মধ্যেই প্রশ্ন রয়েছে।
ধোঁকা ও প্রতারণা ইসলামে নিষিদ্ধ
নাগরিকত্ব বা ভিসার সুবিধা নেওয়ার জন্য বাস্তব বৈবাহিক সম্পর্কের উদ্দেশ্য ছাড়া চুক্তিভিত্তিক বিয়ে করা মূলত প্রতারণা ও অসত্যের আশ্রয় নেওয়ার শামিল। ইসলামে ধোঁকা ও প্রতারণা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
কুরআন মজিদে আল্লাহ তাআলা মিথ্যা ও অসত্য থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন—
فَاجْتَنِبُوا الرِّجْسَ مِنَ الْأَوْثَانِ وَاجْتَنِبُوا قَوْلَ الزُّورِ
অর্থ: ‘সুতরাং তোমরা মূর্তিপূজার অপবিত্রতা থেকে বেঁচে থাকো এবং পরিহার করো মিথ্যা কথা।’
—সুরা আল-হজ: ৩০
এ ছাড়া রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَنْ غَشَّنَا فَلَيْسَ مِنَّا
অর্থ: ‘যে ব্যক্তি আমাদের সঙ্গে ধোঁকাবাজি বা প্রতারণা করে, সে আমার দলভুক্ত নয়।’
—সহিহ মুসলিম: ১০২
অন্য এক হাদিসে মুনাফিকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে মিথ্যা বলা ও আমানতের খেয়ানতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
—সহিহ বুখারি: ৩৩
শরিয়তসম্মত আকদ হলে বিয়ে কার্যকর
চুক্তিভিত্তিক বিয়ের ক্ষেত্রে উদ্দেশ্য অসৎ হলেও, যদি শরিয়তের নির্ধারিত নিয়মে বিবাহের আকদ সম্পন্ন হয়, তাহলে ইসলামি আইনে সেই বিয়ের বৈবাহিক প্রভাব তৈরি হয়।
যোগ্য সাক্ষীর উপস্থিতিতে ইজাব ও কবুলের মাধ্যমে শরিয়তসম্মতভাবে বিবাহ সম্পন্ন হলে তা বিবাহ হিসেবে গণ্য হবে। বিয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শুধু ‘মজা’, ‘অভিনয়’ বা সাময়িক উদ্দেশ্যের অজুহাত গ্রহণযোগ্য নয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
ثَلاَثٌ جِدُّهُنَّ جِدٌّ وَهَزْلُهُنَّ جِدٌّ: النِّكَاحُ، وَالطَّلاَقُ، وَالرَّجْعَةُ
অর্থ: ‘তিনটি বিষয় এমন, যা গম্ভীরভাবে করলেও কার্যকর এবং ঠাট্টা-ছলে করলেও কার্যকর—বিবাহ, তালাক ও স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়া।’
—তিরমিজি: ১১৮৪; আবু দাউদ: ২১৯৪
অতএব, শরিয়তের শর্ত পূরণ করে ইজাব-কবুল সম্পন্ন হলে তারা স্বামী-স্ত্রী হিসেবে গণ্য হবেন। পরবর্তীতে আলাদা হতে চাইলে শরিয়তসম্মতভাবে তালাক বা খোলার মাধ্যমে বিবাহবিচ্ছেদ করতে হবে।
বিচ্ছেদ না হওয়া পর্যন্ত স্ত্রী অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারবেন না। এ অবস্থায় অন্যত্র বিয়ে করলে তা বৈধ হবে না।
শুধু কাগজে স্বাক্ষর করলেই বিয়ে নয়
অন্যদিকে, যদি শরিয়তসম্মত ইজাব-কবুল সম্পন্ন না হয়ে কেবল কাগজপত্র বা রেজিস্ট্রি নথিতে স্বাক্ষর করা হয় এবং সাক্ষীদের সামনে বিবাহের আকদ না হয়, তাহলে ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে সেটিকে বিবাহ হিসেবে গণ্য করা হবে না।
এ ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রীর বৈবাহিক সম্পর্কও তৈরি হবে না এবং আলাদা হওয়ার জন্য পৃথক তালাকের প্রয়োজন হবে না।
সুতরাং নাগরিকত্ব, ভিসা বা অন্য কোনো সুবিধা নেওয়ার উদ্দেশ্যে প্রতারণামূলকভাবে বিয়ের ব্যবস্থা করা ইসলামি নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আর শরিয়তের নিয়ম মেনে আকদ সম্পন্ন হলে সেটিকে নিছক ‘চুক্তি’ বা ‘কাগজের বিয়ে’ বলে অকার্যকর মনে করার সুযোগ নেই।
প্রতিবেদকের নাম 




















