বিগত নির্বাচনগুলোতে প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের অর্থ দেওয়ার মাধ্যমে প্রভাবিত করার সংস্কৃতি ছিল বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি দাবি করেছেন, নির্বাচনের সময় থানার পরিধি অনুযায়ী ইউএনওকে ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা, ওসিকে ১ কোটি টাকা এবং ডিসিকেও বিপুল অঙ্কের অর্থ দেওয়া হতো।
তবে এবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তাকে ১০ টাকাও দেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন মন্ত্রী। তার ভাষায়, আগের সেই ‘ঘুস-দুর্নীতির মহারণ্য’ থেকে দেশ বেরিয়ে আসছে।
সোমবার (৩১ আগস্ট) দুপুর ১২টায় মানিকগঞ্জে আইনশৃঙ্খলা, উন্নয়নমূলক ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম সমন্বয়ের লক্ষ্যে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘বিগত আমলে নির্বাচন এলে ইউএনও সাহেব পেতেন ন্যূনতম ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা, থানার পরিধি ভেদে। ওসি সাহেব পেতেন ১ কোটি, ডিসি সাহেবও পেতেন। সব ছিল ঘুসের দুর্নীতির মহারণ্য। এবার একটা ইলেকশন হয়েছে, ১০ টাকা কেউ পেয়েছেন? আমি কাউকে ১০ টাকা দিইনি, চায়ওনি।’
মন্ত্রী বলেন, আগের তুলনায় এবার প্রশাসনের কর্মকর্তারা কোনো আর্থিক সুবিধা ছাড়াই বেশি কাজ করেছেন এবং জনগণের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছেন। অতীতে কর্মকর্তাদের একদিকে চাকরি হারানোর ভয় দেখানো হতো, অন্যদিকে রাজনৈতিকভাবে খুশি রাখতে অনৈতিক সুবিধা নিতে বাধ্য করা হতো।
তিনি আরও বলেন, ‘নিতে হবে, নেন; চুরি করতে হবে, নেন’—এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল। সেই দিন এখন চলে গেছে। দায়িত্ব পালনে সবাইকে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে অতীতের দুর্নীতির উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, ঠিকাদারদের মন্ত্রীর কক্ষে প্রবেশের ক্ষেত্রেও পিয়নদের টাকা দিতে হতো। নার্স ও চিকিৎসকদের বদলির ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট অঙ্কের ঘুসের প্রচলন ছিল বলে দাবি করেন তিনি।
মাদক ও জুয়া নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, জুয়া, অনলাইন জুয়া ও বিভিন্ন ধরনের মাদকের কারণে সমাজে অপরাধ বাড়ছে। ইয়াবাসহ সব ধরনের মাদকের বিস্তার বন্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এসব অপরাধে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
স্বাস্থ্য খাতের সংকট তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশের স্বাস্থ্যসেবায় নানা সংকট ও অব্যবস্থাপনা রয়েছে। হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক, নার্স, প্রয়োজনীয় জনবল ও আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকট রয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ছয় মাসে এসব সমস্যা সমাধানে কাজ শুরু হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, দেশের প্রতিটি উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালে পর্যায়ক্রমে শয্যা সংখ্যা বাড়ানো হবে। রোগীদের খাবারের মান উন্নয়ন, ডায়ালাইসিস রোগী ও শিশুদের জন্য পৃথক বেড এবং বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা করা হবে। ইউনিয়ন পর্যায়েও স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, সমাজের প্রতিটি স্তর থেকে দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সঙ্গে কাজ করতে হবে এবং জনগণের অধিকার নিশ্চিত করাই সরকারের মূল দায়িত্ব।
সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে খাদ্যমন্ত্রী ও মানিকগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য আফরোজা খানম রিতা মানিকগঞ্জকে একটি মডেল জেলা হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি সমাজ থেকে মাদক নির্মূলে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন মানিকগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য এসএ জিন্নাহ কবির, মানিকগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য মঈনুল ইসলাম খান শান্ত, জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জামিলুর রশিদ খান, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সারোয়ার আলমসহ জেলার বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তারা।
প্রতিবেদকের নাম 




















