খুলনার উপকূলীয় উপজেলা দাকোপে নদীভাঙন দিন দিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। শিবসা, ঢাকী, চুনকুড়ি, পশুর, ঝপঝপিয়া ও মাঙ্গার মতো নদীর অব্যাহত ভাঙনে বসতভিটা, জমিজমা ও সহায়-সম্পত্তি হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। অনেক পরিবার সর্বস্ব হারিয়ে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে।
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে তিনটি পৃথক দ্বীপ নিয়ে গঠিত দাকোপে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের পাশাপাশি নদীভাঙন স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকাকে অনিশ্চিত করে তুলেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) আওতাধীন উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা ৩১, ৩২ ও ৩৩ নম্বর পোল্ডারে বিভক্ত। ৩১ নম্বর পোল্ডারের আওতায় রয়েছে চালনা পৌরসভা, পানখালী ও তিলডাঙা ইউনিয়ন। ৩২ নম্বর পোল্ডারে কামারখোলা ও সুতারখালী ইউনিয়ন এবং ৩৩ নম্বর পোল্ডারে বাজুয়া, দাকোপ, কৈলাশগঞ্জ, লাউডোভ ও বানিশান্তা ইউনিয়ন অন্তর্ভুক্ত।
নতুন বাঁধেও ভাঙন, সবচেয়ে ঝুঁকিতে ৩১ নম্বর পোল্ডার
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিশ্বব্যাংকের ১৫০ কোটি টাকা ঋণে ৩২ ও ৩৩ নম্বর পোল্ডারে নতুন ওয়াপদা বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। তবে এসব পোল্ডারের নতুন কিছু এলাকাতেও ভাঙন দেখা দিয়েছে।
সবচেয়ে নাজুক পরিস্থিতি ষাটের দশকে নির্মিত ৩১ নম্বর পোল্ডারে। চালনা পৌরসভা, পানখালী ও তিলডাঙা ইউনিয়নের বিভিন্ন অংশে বেড়িবাঁধ ভেঙে সড়ক নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। কোথাও বালুভর্তি জিও টিউব দিয়ে সাময়িকভাবে পানি আটকানো হলেও ঝুঁকিপূর্ণ অনেক স্থান এখনো অরক্ষিত রয়েছে।
গত ১১ সেপ্টেম্বর সকালে তিলডাঙা ইউনিয়নের বটবুনিয়া এলাকায় বেড়িবাঁধ ভেঙে ঢাকী নদীতে বিলীন হলে তাৎক্ষণিকভাবে সাতটি পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়ে। পরে দ্রুত জিও টিউব দিয়ে রিং বাঁধ নির্মাণ করায় হাজারো পরিবার এবং প্রায় ৪ হাজার বিঘা জমির ফসল রক্ষা পায়।
এর আগেও বটবুনিয়া এলাকায় একাধিকবার বেড়িবাঁধ ভেঙে মানুষের ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়েছে।
পানখালী ইউনিয়নের খোনা মোল্লাবাড়ি ও খলিশা এলাকার বিভিন্ন পয়েন্টেও একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে। সম্প্রতি এসব এলাকার বেড়িবাঁধের মূল অংশ নদীতে বিলীন হলে খোনা এলাকায় বালুভর্তি জিও টিউব দিয়ে রিং বাঁধ এবং খলিশা এলাকায় মাটি দিয়ে বাঁধ পুনর্নির্মাণ করা হয়।
ভাঙনের কারণে নদীগর্ভে তলিয়ে যাচ্ছে মানুষের বসতভিটা। অনেক ক্ষেত্রে বাঁধ নির্মাণের জন্য ক্ষতিগ্রস্তদের ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি ব্যবহার করা হলেও তারা কোনো ক্ষতিপূরণ পান না বলে অভিযোগ রয়েছে।
‘নদী সব গিলে ফেলেছে’
নদীভাঙনে সর্বস্ব হারানো তিলডাঙার বটবুনিয়া এলাকার বাসিন্দা রিনা সরদার বলেন, “আমার আর কিছু নেই, নদী সব গিলে ফেলেছে। কয়েক দফা ভাঙতে ভাঙতে জায়গা-জমি সব গেছে নদীতে। এখন অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে অন্যের জায়গায় থাকছি।”
পানখালীর খোনা এলাকার বাসিন্দা লিটন মোল্লা বলেন, “আমাদের আগে যেখানে বাড়ি ছিল, এখন সেখানে মাঝ নদী। আমাদের মতো অনেক পরিবার ছিল, কিন্তু সব হারিয়ে গেছে নদীর মাঝে। কেউ ভেতরে এসে বাড়ি করেছে, আবার কেউ অন্য এলাকায় চলে গেছে।”
ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা, স্থায়ী পুনর্বাসনে সংকট
দাকোপ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. বোরহান উদ্দিন মিটু জানান, বটবুনিয়া এলাকায় নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত সাতটি পরিবারকে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে শুকনা খাবার ও ৬ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের স্থায়ী পুনর্বাসনের জন্য আপাতত পর্যাপ্ত বরাদ্দ নেই। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
ইউএনও আরও জানান, নদীভাঙনকবলিত এলাকার পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
খুলনা পানি উন্নয়ন বোর্ড বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী রাশিদুর রহমান বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলো চিহ্নিত করে জরুরি ভিত্তিতে জিও টিউব স্থাপন ও বাঁধ সংস্কারের কাজ চলছে। নদীভাঙন রোধে স্থায়ী প্রকল্পের প্রস্তাব করা হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে দ্রুত স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু হবে।
নদীভাঙন দাকোপের মানুষের জন্য ক্রমেই বড় সংকটে পরিণত হচ্ছে। জরুরি সংস্কার ও সাময়িক প্রতিরোধের পাশাপাশি স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন নিশ্চিত না হলে উপকূলের আরও বহু পরিবার ভিটেমাটি হারানোর ঝুঁকিতে থাকবে।
প্রতিবেদকের নাম 























