দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা তাদের প্রাপ্য অবসর ও কল্যাণসুবিধার অর্থ পেতে শুরু করেছেন। আবেদনকারী শিক্ষক-কর্মচারীদের অনুকূলে একসঙ্গে এসব সুবিধার একাংশের অর্থ ছাড় করেছে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসরসুবিধা বোর্ড এবং শিক্ষক ও কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট।
দীর্ঘদিন ধরেই অবসরসুবিধার অর্থ পেতে নানা জটিলতার মুখে পড়তে হচ্ছিল শিক্ষক-কর্মচারীদের। অনেককে অবসরের পর প্রাপ্য অর্থের জন্য তিন থেকে চার বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। এ নিয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগও ছিল।
গত শনিবার বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসর ও কল্যাণসুবিধার অর্থ প্রদান কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়। একই দিন আবেদনকারী শিক্ষক-কর্মচারীদের অনুকূলে অর্থ ছাড় করা হয়। অনেকের মুঠোফোনে খুদে বার্তার মাধ্যমে অর্থ ছাড়ের তথ্যও জানানো হয়েছে।
তবে এবার যে অর্থ দেওয়া হচ্ছে, তা শিক্ষক-কর্মচারীদের পুরো প্রাপ্য নয়। আপাতত চাকরিকালে বেতন থেকে কেটে রাখা চাঁদার একটি অংশ পরিশোধ করা হচ্ছে। বাকি অর্থ পরবর্তী সময়ে দেওয়ার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
অবসরসুবিধা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, এবার ৭০ হাজার ১১৯ জন শিক্ষক-কর্মচারীর অনুকূলে অবসরসুবিধার একাংশের অর্থ ছাড় করা হচ্ছে। এ জন্য ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা। ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত যারা অবসরসুবিধার জন্য আবেদন করেছেন, তাদের অনুকূলে এই অর্থ দেওয়া হচ্ছে।
ইতোমধ্যে অনেক শিক্ষক-কর্মচারী অর্থ পেয়েছেন। যারা এখনো পাননি, তাদের পর্যায়ক্রমে অর্থ দেওয়ার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তবে চার হাজারের বেশি আবেদনকারীর আবেদন অসম্পূর্ণ থাকায় তাদের অনুকূলে আপাতত অর্থ ছাড় করা যায়নি। এ ছাড়া আবেদনে বিভিন্ন ধরনের ভুল থাকায় আরও কিছু আবেদনকারীর অর্থ আটকে আছে।
কল্যাণসুবিধার ক্ষেত্রেও একইভাবে একাংশের অর্থ ছাড় করা হয়েছে। ৫৩ হাজার ৪৭৭টি আবেদনের বিপরীতে প্রায় ৬৪৭ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। একজন শিক্ষক-কর্মচারী অবসরসুবিধার পাশাপাশি কল্যাণসুবিধাও পাওয়ার সুযোগ পান।
চাকরিকালে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন থেকে কেটে রাখা চাঁদা, ব্যাংকে জমা অর্থের সুদ এবং বিভিন্ন সময়ে সরকারের দেওয়া বরাদ্দ ও বন্ডের মুনাফার ওপর নির্ভর করেই মূলত এসব সুবিধার অর্থ পরিশোধ করা হয়।
কল্যাণসুবিধার ক্ষেত্রে একজন শিক্ষক-কর্মচারী সর্বনিম্ন প্রায় ৫ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৩ লাখ ১৬ হাজার টাকা পর্যন্ত পেয়েছেন বা পাচ্ছেন। অন্যদিকে অবসরসুবিধার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সাড়ে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত এবার দেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ‘আইবাস প্লাস প্লাস’ সফটওয়্যারের মাধ্যমে সরাসরি শিক্ষক-কর্মচারীদের ব্যাংক হিসাবে অর্থ পাঠানো হচ্ছে। এ জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র ও ব্যাংক হিসাবের তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। আবেদনে সামান্য ভুল থাকলেও অর্থ পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। প্রয়োজনীয় তথ্য সংশোধনের পর আবার অর্থ পাঠানো হবে।
রোববার (১৬ আগস্ট) রাজধানীর ইস্কাটন গার্ডেন এলাকায় অবসরসুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টের কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, কয়েকজন শিক্ষক-কর্মচারী বা তাদের স্বজনেরা অর্থ না পাওয়ার বিষয়ে খোঁজ নিতে এসেছেন। কর্মকর্তারা তাদের সমস্যার কথা শুনে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে বলেছেন।
একজন অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ জানান, তার মোট অবসরসুবিধার পরিমাণ অনেক বেশি হলেও এবার তুলনামূলকভাবে কম অর্থ পেয়েছেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাকে জানান, আপাতত চাকরিকালে বেতন থেকে কেটে রাখা চাঁদার অংশের অর্থ দেওয়া হচ্ছে। বাকি অর্থ পরবর্তী সময়ে পরিশোধ করা হবে।
কল্যাণ ট্রাস্টে আসা এক অবসরপ্রাপ্ত নারী শিক্ষক জানান, তিনি প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা পেয়েছেন। তবে বাকি অর্থ কবে পাবেন, সে বিষয়ে জানতে চাইলে কর্মকর্তারা জানান, এটিও কল্যাণসুবিধার একাংশ; বাকি অর্থ পরবর্তী সময়ে দেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আরও জানান, কোনো কোনো আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক হিসাব কিংবা মনোনীত ব্যক্তির কাগজপত্রে সমস্যা রয়েছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পর এসব সমস্যা সংশোধন করে পুনরায় অর্থ পাঠানো হবে।
সারা দেশে এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা ছয় লাখের বেশি। তাদের অবসর ও কল্যাণসুবিধা দুটি পৃথক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। শিক্ষক ও কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট কল্যাণসুবিধা এবং শিক্ষক ও কর্মচারী অবসরসুবিধা বোর্ড অবসরসুবিধা দিয়ে থাকে।
অবসরসুবিধার জন্য চাকরিকালে শিক্ষক-কর্মচারীদের মূল বেতনের ৬ শতাংশ এবং কল্যাণসুবিধার জন্য ৪ শতাংশ চাঁদা কেটে রাখা হয়। ২০১৯ সাল পর্যন্ত এই হারে চাঁদা নেওয়া হয়েছে। এর আগে অবসরসুবিধার জন্য ৪ শতাংশ এবং কল্যাণসুবিধার জন্য ২ শতাংশ হারে চাঁদা নেওয়া হতো।
এ ছাড়া প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে বছরে ১০০ টাকা নেওয়া হয়। এর মধ্যে ৭০ টাকা অবসরসুবিধা এবং ৩০ টাকা কল্যাণসুবিধা তহবিলে জমা হয়।
এখন পর্যন্ত আবেদন করা ৭০ হাজার ১১৯ জন শিক্ষক-কর্মচারীর অবসরসুবিধার পুরো অর্থ পরিশোধ করতে প্রয়োজন প্রায় ৯ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা। বিপরীতে অবসরসুবিধা বোর্ডে বর্তমানে রয়েছে প্রায় ১ হাজার ৭৫৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা এবার দেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের হিসাবে, শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছ থেকে অবসরসুবিধার জন্য প্রতি মাসে প্রায় ১০৪ কোটি টাকা জমা হয়। অথচ অবসর নেওয়া শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রাপ্য পুরো অর্থ পরিশোধ করতে মাসে গড়ে প্রায় ২১০ কোটি টাকা প্রয়োজন হয়। ফলে প্রতি মাসেই বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তারা বলছেন, আবেদনকারীদের পুরো প্রাপ্য অর্থ দ্রুত পরিশোধ করতে হলে সরকারের বিশেষ বরাদ্দ প্রয়োজন। তাই এখন একাংশের অর্থ পরিশোধের পর শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রত্যাশা, দ্রুত তাদের বাকি প্রাপ্য সুবিধাও পরিশোধের ব্যবস্থা করা হবে।
প্রতিবেদকের নাম 




















