
নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের অপেক্ষা যেন শেষই হচ্ছে না। গত ৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভায় নতুন পে-স্কেল অনুমোদনের পর প্রায় দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও এখনো প্রজ্ঞাপন বা গেজেট প্রকাশিত হয়নি। দীর্ঘ ১০ বছর পর নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদনের খবরে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে স্বস্তি তৈরি হলেও প্রজ্ঞাপন জারিতে বিলম্ব হওয়ায় অনেকের মধ্যে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ ও হতাশা।
তবে সংশ্লিষ্ট সাবেক আমলা ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, এ নিয়ে হতাশ হওয়ার কারণ নেই। তাদের মতে, নতুন বেতন কাঠামোর মতো বড় ও সংবেদনশীল একটি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের প্রজ্ঞাপন জারির আগে প্রশাসনিক, আইনি ও আর্থিক বেশ কিছু ধাপ সম্পন্ন করতে হয়। এসব প্রক্রিয়া যথাযথভাবে শেষ করতেই সময় লাগছে।
আইন মন্ত্রণালয়ে যায়নি খসড়া
প্রাথমিকভাবে নতুন পে-স্কেলের খসড়া আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হয়েছে—এমন খবর প্রকাশিত হয়েছিল। তবে অর্থ ও আইন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খসড়াটি এখনো আইন মন্ত্রণালয়ে পৌঁছায়নি। এটি বর্তমানে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখায় প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বিষয়টি কোনো ফাইল আটকে থাকার কারণে নয়। বরং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন, ভাতা, সুযোগ-সুবিধা ও বাস্তবায়নসংক্রান্ত নির্দেশনা সমন্বয় করে একটি ত্রুটিমুক্ত প্রজ্ঞাপনের খসড়া প্রস্তুত করতে সময় প্রয়োজন হচ্ছে।
বিশেষ করে শুধু বেসামরিক প্রশাসন নয়, সশস্ত্র বাহিনী—সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী—পাশাপাশি বিজিবি, পুলিশ, সরকারি ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের বেতন কাঠামো কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, তার সুনির্দিষ্ট রূপরেখা ও হিসাবও খসড়ায় অন্তর্ভুক্ত করতে হচ্ছে।
মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পরও থাকে কয়েক ধাপ
সাবেক সচিব ড. মো. আনোয়ার উল্ল্যাহর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মন্ত্রিসভায় মূলত নতুন বেতন কাঠামোর গ্রেডভিত্তিক প্রস্তাবের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। কিন্তু প্রজ্ঞাপনে কোন শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীর ক্ষেত্রে কীভাবে তা কার্যকর হবে, সেই বিস্তারিত হিসাব ও প্রয়োজনীয় বিধিবদ্ধ আদেশের খসড়া তৈরি করতে হয় অর্থ মন্ত্রণালয়কে।
এরপর প্রস্তুত করা খসড়াটি আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হয়। সেখানে প্রস্তাবিত কাঠামোর সঙ্গে সংবিধান, বিদ্যমান চাকরি আইন বা অন্যান্য বিধিবিধানের কোনো সাংঘর্ষিক বিষয় রয়েছে কি না, তা যাচাই করা হয়।
আইনি যাচাই শেষ হলে চূড়ান্ত খসড়া সরকারি মুদ্রণালয় বা বিজি প্রেসে পাঠানো হয়। সেখানে মুদ্রণ শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
আগের পে-স্কেলেও লেগেছিল কয়েক মাস
নতুন পে-স্কেলের গেজেট জারিতে বর্তমান বিলম্বকে অস্বাভাবিক মনে করছেন না অভিজ্ঞ আমলারা। এর আগের নজিরও রয়েছে।
২০১৫ সালে অষ্টম জাতীয় পে-স্কেল মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পেয়েছিল ৭ সেপ্টেম্বর। এরপর চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন জারি হয় ১৫ ডিসেম্বর—অর্থাৎ অনুমোদনের পর প্রায় সাড়ে তিন মাস সময় লেগেছিল।
সেই তুলনায় এবার মন্ত্রিসভার অনুমোদনের মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে গেজেট প্রকাশ না হওয়াকে দীর্ঘসূত্রতা হিসেবে দেখছেন না সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদারসহ সংশ্লিষ্টরা।
দ্রুত ভেটিংয়ের আশা
আইন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে খসড়া ভেটিংয়ের জন্য হাতে পাওয়ার পর দ্রুতই যাচাই-বাছাইয়ের কাজ শুরু করা হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, প্রজ্ঞাপনের খসড়া চূড়ান্ত করার কাজ এখন অর্থ মন্ত্রণালয়ে চলছে। বিভিন্ন খাতের বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা বাস্তবায়নের বিষয়গুলো সমন্বয় করে ত্রুটিমুক্ত খসড়া প্রস্তুত হলেই তা আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। এরপর ভেটিং ও মুদ্রণসহ আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষে নতুন পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশ করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের বহুল প্রতীক্ষিত নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হওয়ার ক্ষেত্রে আপাতত মূল অপেক্ষা খসড়া চূড়ান্ত ও পরবর্তী প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার।
প্রতিবেদকের নাম 




















