পঞ্চগড়ে জমিতে প্রতি পিস লাউ বিক্রি হচ্ছে মাত্র ২ থেকে ৩ টাকায়। অথচ স্থানীয় বাজারে একই লাউয়ের দাম ২০ থেকে ২৫ টাকা, আর রাজধানী ঢাকায় তা বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকায়। ভালো ফলন পেয়েও ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় উৎপাদন খরচ তুলতে পারছেন না কৃষকেরা। লোকসানের আশঙ্কায় অনেকে জমিতেই লাউ ফেলে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। অন্যদিকে, কয়েক গুণ বেশি দামে সবজি কিনতে হচ্ছে ক্রেতাদের।
সীমান্তবর্তী জেলা পঞ্চগড়ের বিভিন্ন এলাকায় এবার লাউয়ের ভালো ফলন হয়েছে। গাছে গাছে ঝুলছে সবুজ লাউ, কিন্তু বাজারে দাম কম থাকায় কৃষকদের মুখে হাসি নেই। আটোয়ারী উপজেলাসহ জেলার বিভিন্ন এলাকার চাষিরা বলছেন, মাঝারি আকারের একটি লাউ জমিতে বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ২ টাকায়। তুলনামূলক বড় বা ভালো মানের লাউয়ের দামও ৩ টাকার বেশি পাওয়া যাচ্ছে না।
কৃষকদের অভিযোগ, এত কম দামে লাউ বিক্রি করে উৎপাদন খরচ তো উঠছেই না, শ্রমিকের মজুরি ও পরিবহন ব্যয় মেটানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে অনেককে লোকসান দিয়ে সবজি বিক্রি করতে হচ্ছে, কেউ কেউ জমিতে থাকা লাউ কেটেও ফেলে দিচ্ছেন।
এক কৃষক জানান, এক বিঘা জমিতে লাউ চাষ করতে তাঁর প্রায় ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। অথচ এখন পর্যন্ত লাউ বিক্রি করে আয় হয়েছে মাত্র ১৫ হাজার টাকা। এতে বড় অঙ্কের লোকসানের মুখে পড়েছেন তিনি।
আরেক চাষি বলেন, একই জমিতে ধান চাষ করলে অন্তত ১০ হাজার টাকার মতো আয় করা যেত। কিন্তু লাউ চাষ করে এখন লোকসান গুনতে হচ্ছে। বাজারে ক্রেতা না থাকায় উৎপাদিত লাউ বিক্রি করতে না পেরে জমিতেই ফেলে দিতে হচ্ছে বলেও জানান কয়েকজন কৃষক।
মাঠ থেকে রাজধানী—দামের ব্যবধান কয়েক গুণ
কৃষকের কাছ থেকে পাইকার ও মধ্যস্বত্বভোগীরা নামমাত্র দামে লাউ কিনছেন। এরপর কয়েক দফা হাতবদল হয়ে সেগুলো পৌঁছাচ্ছে স্থানীয় বাজার ও শহরের খুচরা দোকানে। ফলে জমিতে ২ থেকে ৩ টাকায় বিক্রি হওয়া একটি লাউ স্থানীয় বাজারে ১৫ থেকে ২৫ টাকায় এবং রাজধানীতে ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
বাজারে বেশি দামে লাউ কিনতে গিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন ক্রেতারাও। তাঁদের প্রশ্ন, কৃষক যখন উৎপাদিত সবজির ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না, তখন ভোক্তাকে কেন কয়েক গুণ বেশি দাম দিতে হচ্ছে? মাঠ ও খুচরা বাজারের দামের এই বিশাল ব্যবধানের সুবিধা কারা পাচ্ছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।
তবে আড়তদার ও খুচরা বিক্রেতাদের দাবি, পরিবহন, ওঠানো-নামানো এবং বিভিন্ন পর্যায়ে হাতবদলের খরচ যুক্ত হওয়ায় মাঠপর্যায়ের দামের সঙ্গে খুচরা বাজারের দামের পার্থক্য তৈরি হয়। তাঁদের মতে, এসব ব্যয় মেটানোর পরও এবার লাউ বিক্রি করে লাভ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
একসঙ্গে উৎপাদন বাড়ায় কমেছে দাম
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পঞ্চগড়ে প্রতিবছর গড়ে ৫০০ থেকে ৬০০ হেক্টর জমিতে লাউ চাষ হয়। এবার একসঙ্গে অনেক কৃষক লাউ উৎপাদন করায় একই সময়ে বাজারে সরবরাহ বেড়েছে। তবে উৎপাদন ভালো হওয়ার পরও কৃষকেরা কেন ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুল মতিন বলেন, কৃষকেরা সরাসরি বাজারে গিয়ে পণ্য বিক্রি করতে পারলে ন্যায্যমূল্য পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। এবার একই সময়ে অনেক কৃষকের লাউ বাজারে আসায় সরবরাহ বেড়েছে। কয়েক দিনের মধ্যে সরবরাহ কমে এলে কৃষকেরা তুলনামূলক ভালো দাম পেতে পারেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
অন্যদিকে, পঞ্চগড়ের কৃষি বিপণন কর্মকর্তা মুয়ালেনা খানম জানান, তাঁদের দপ্তরে জনবল ও লজিস্টিক সহায়তার ঘাটতি রয়েছে। এ কারণে কৃষকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে সীমাবদ্ধতার মুখে পড়তে হচ্ছে। তবে দ্রুত এ সমস্যা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা চলছে বলে জানান তিনি।
কৃষকের উৎপাদিত লাউ জমিতে বিক্রি হচ্ছে নামমাত্র দামে, অথচ একই সবজি কিনতে ভোক্তাকে গুনতে হচ্ছে কয়েক গুণ বেশি অর্থ। এই ব্যবধান কমাতে কার্যকর বাজার তদারকি, কৃষকের সরাসরি বিপণনের সুযোগ এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় চাষিরা।
প্রতিবেদকের নাম 





















