‘শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড’—এই বহুল প্রচলিত কথার গুরুত্ব নিয়ে প্রশ্ন নেই। তবে সময়ের সঙ্গে বদলে যাচ্ছে শিক্ষার ধরন ও প্রয়োজন। শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান কিংবা পরীক্ষায় ভালো ফল নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তুলতে প্রয়োজন সৃজনশীলতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, নৈতিকতা, নেতৃত্ব ও বাস্তব জীবনের সক্ষমতা।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে কাঠামোগত ও নীতিগত নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। শিক্ষাক্রমের ঘন ঘন পরিবর্তন, বাস্তবায়নের সীমাবদ্ধতা, দক্ষ শিক্ষক সংকট এবং শহর-গ্রামের শিক্ষার সুযোগের বৈষম্য এখনো বড় বিষয়। ফলে নতুন শিক্ষাক্রম প্রণয়নের পাশাপাশি এর বাস্তবায়ন সক্ষমতা বাড়ানোও জরুরি হয়ে পড়েছে।
সম্প্রতি তরুণ শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিক্ষা, ক্রীড়া, সংগীত, সংস্কৃতি ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নিজেদের যোগ্য ও আত্মবিশ্বাসী করে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন। দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন ও নেতৃত্বের সক্ষমতা অনেকাংশে নির্ভর করছে বর্তমান প্রজন্মকে কীভাবে জ্ঞান, দক্ষতা ও মূল্যবোধসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে তার ওপর।
এই বাস্তবতায় ২০২৮ সাল থেকে নতুন জাতীয় শিক্ষাক্রম চালুর পরিকল্পনাকে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সাল থেকে বিদ্যমান শিক্ষাক্রমে কিছু সংশোধনের পাশাপাশি ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞানবিষয়ক পাঠ্যপুস্তক হালনাগাদ করা হবে।
প্রস্তাবিত শিক্ষাক্রমে চতুর্থ শ্রেণি থেকে ‘ক্রীড়া, শারীরিক শিক্ষা ও সংস্কৃতি’, ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে ‘কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা’ এবং ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় ভাষা শেখার সুযোগ সম্প্রসারণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তবে শুধু পাঠ্যক্রম পরিবর্তন করলেই শিক্ষাব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। এর সঙ্গে প্রয়োজন আধুনিক শিক্ষণপদ্ধতি, দক্ষ শিক্ষক, প্রযুক্তিনির্ভর শ্রেণিকক্ষ এবং শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ।
অনুসন্ধানভিত্তিক শিক্ষা, সৃজনশীল সমস্যা সমাধান, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতভিত্তিক শিক্ষা বা এসটিইএম, রোবটিকস, বিজ্ঞান মেলা, বিতর্ক, গবেষণা ও বিভিন্ন শিক্ষার্থী ক্লাব শিক্ষার্থীদের চিন্তাশক্তি ও সৃজনশীলতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে ক্রীড়া, সংগীত, শিল্প-সংস্কৃতি ও নেতৃত্বমূলক কর্মকাণ্ড আত্মবিশ্বাস ও দলগত কাজের মানসিকতা তৈরিতে সহায়ক।
‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও শিক্ষার্থীদের মানসিক ও সামাজিক সুস্থতার বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে। এ জন্য নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশের পাশাপাশি কাউন্সেলিং, স্বাস্থ্য সহায়তা, জীবনদক্ষতা শিক্ষা এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর ইতিবাচক সম্পর্ক নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
শিক্ষাব্যবস্থায় সততা, নৈতিকতা, শৃঙ্খলা, দায়িত্বশীলতা ও পারস্পরিক সম্মানের মতো মূল্যবোধও ছোটবেলা থেকেই গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া দরকার। কারণ ভবিষ্যতের নাগরিক শুধু জ্ঞানী হলেই হবে না; তাকে দায়িত্বশীল ও মানবিকও হতে হবে।
নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নে বিশেষায়িত দক্ষতাসম্পন্ন শিক্ষক ও প্রশিক্ষকের প্রয়োজন হবে। বিজ্ঞান ক্লাব, রোবটিকস, ক্রীড়া, সংস্কৃতি, জীবনদক্ষতা ও নেতৃত্ব বিকাশের মতো ক্ষেত্রগুলোতে কার্যকর প্রশিক্ষণ দিতে শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি তাদের ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়নও নিশ্চিত করতে হবে।
এই ধরনের শিক্ষার বাস্তব প্রয়োগের উদাহরণ হিসেবে বসুন্ধরা পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষা কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করা যায়। ‘দেশ ও মানুষের কল্যাণে’ মূলমন্ত্র সামনে রেখে বসুন্ধরা গ্রুপ শিক্ষা ও ক্রীড়াক্ষেত্রেও বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন বসুন্ধরা পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করে।
প্রায় ১০ বিঘা বিস্তৃত ক্যাম্পাসে প্রতিষ্ঠানটির আটতলা ভবনে রয়েছে ৮৯টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত শ্রেণিকক্ষ। ইন্টার্যাক্টিভ মাল্টিমিডিয়া ডিসপ্লে, উচ্চগতির ইন্টারনেট ও অডিও-ভিজ্যুয়াল সুবিধার পাশাপাশি রয়েছে বিজ্ঞান, কম্পিউটার ও আইসিটি, ভাষা শিক্ষা, এসটিইএম ও রোবটিকস এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের জন্য বিশেষায়িত সুবিধা।
শিক্ষার্থীদের বহুভাষিক দক্ষতা তৈরিতেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির ভাষা শিক্ষা ল্যাবে বর্তমানে ইংরেজি, আরবি ও ফরাসি ভাষা শেখানো হচ্ছে। ভবিষ্যতে আরও ভাষা যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়াতে আয়োজন করা হচ্ছে বাংলা অলিম্পিয়াড।
প্রস্তাবিত শিক্ষাক্রমে ক্রীড়া ও শারীরিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টিও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি ক্রীড়া শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব, দলগত কাজ ও মানসিক দৃঢ়তা গড়ে তুলতে সহায়তা করে।
বসুন্ধরা স্পোর্টস কমপ্লেক্সের সুবিধা কাজে লাগিয়ে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীরা সাঁতার, ফুটবল, ক্রিকেট, ফুটসাল, টেনিস, ব্যাডমিন্টন, বাস্কেটবল, অ্যাথলেটিকস, তায়কোয়ান্দো, টেবিল টেনিস ও স্কোয়াশসহ বিভিন্ন খেলায় প্রশিক্ষিত কোচের অধীনে প্রশিক্ষণের সুযোগ পাচ্ছে। সম্ভাবনাময় খেলোয়াড়দের উচ্চতর পর্যায়ের প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের আনন্দময় ও নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে কাউন্সেলিং, স্বাস্থ্য সহায়তা, জীবনদক্ষতা, নেতৃত্ব বিকাশ, বিভিন্ন ক্লাব ও উদ্ভাবনী কার্যক্রমের সুযোগ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বাড়াতে রয়েছে শিক্ষক সম্পদ কেন্দ্র, প্রশিক্ষণ ও সম্মেলন কক্ষ। নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার মাধ্যমে আধুনিক শিক্ষাপদ্ধতি, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কার্যকর শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনায় শিক্ষকদের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তবে জাতীয় পর্যায়ে নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে সুযোগের বৈষম্য কমানো। একটি আধুনিক বিদ্যালয়ে রোবটিকসের ল্যাব বা কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা তুলনামূলক সহজ হলেও প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিদ্যালয়ে একই সুযোগ নিশ্চিত করা কঠিন। তাই নতুন শিক্ষাক্রমের সাফল্য শুধু শহরের উন্নত বিদ্যালয়গুলোর ওপর নির্ভর করলে চলবে না। দেশের প্রতিটি অঞ্চলের শিক্ষার্থীকে সমান সুযোগের আওতায় আনতে হবে।
এ কারণে নতুন শিক্ষাক্রমকে শুধু পাঠ্যবই বা পরীক্ষাপদ্ধতি পরিবর্তনের উদ্যোগ হিসেবে দেখলে হবে না। এটি পুরো বিদ্যালয় ব্যবস্থাকে আরও সক্ষম ও আধুনিক করে তোলার সুযোগ। মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত—আমরা কেমন শিক্ষার্থী তৈরি করতে চাই?
শিক্ষার্থী কি শুধু পরীক্ষার উত্তর মুখস্থ করবে, নাকি বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে শিখবে? প্রযুক্তি শুধু ব্যবহার করবে, নাকি নতুন কিছু উদ্ভাবনের সক্ষমতাও অর্জন করবে? নিজের ভাষা, ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে ধারণ করে একই সঙ্গে বৈশ্বিক বিশ্বের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার যোগ্যতাও অর্জন করবে কি না—ভবিষ্যৎ শিক্ষাব্যবস্থাকে এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।
এর পাশাপাশি শিক্ষানীতিতে ধারাবাহিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি শিশুকে ভবিষ্যতের পৃথিবীর জন্য প্রস্তুত করতে ১২ থেকে ১৫ বছর সময় লাগে। তাই রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক পরিবর্তনের সঙ্গে শিক্ষার মৌলিক দর্শন বারবার বদলে গেলে দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া কঠিন। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি স্থিতিশীল শিক্ষা-দর্শন।
নীতিগত ধারাবাহিকতা, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ, দক্ষ শিক্ষক, আধুনিক অবকাঠামো এবং কার্যকর পরিবীক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে প্রস্তাবিত শিক্ষাক্রম বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
তবে সেই পরিবর্তন যেন কেবল শহরের কিছু প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেদিকেও নজর দিতে হবে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশুটিও যেন আধুনিক শিক্ষা, প্রযুক্তি, ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও দক্ষতা অর্জনের সমান সুযোগ পায়—জাতীয় শিক্ষাক্রমের প্রকৃত সাফল্য সেখানেই।
শেষ পর্যন্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি প্রজন্ম গড়ে তোলা, যারা শুধু জ্ঞানসমৃদ্ধ নয়; একই সঙ্গে সৃজনশীল, দক্ষ, নৈতিক, আত্মবিশ্বাসী ও দায়িত্বশীল। যারা নিজের দেশ, ইতিহাস, ভাষা ও সংস্কৃতিকে ধারণ করবে এবং পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সক্ষমতাও অর্জন করবে।
বসুন্ধরা পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ শুরু থেকেই শিক্ষা, ক্রীড়া, সংস্কৃতি, প্রযুক্তি, ভাষা ও জীবনদক্ষতার সমন্বিত চর্চার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করার লক্ষ্য নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। প্রস্তাবিত জাতীয় শিক্ষাক্রমে যে আধুনিক, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষার রূপরেখা সামনে এসেছে, তার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা-দর্শনেরও সাযুজ্য রয়েছে।
লেখক: অধ্যক্ষ, বসুন্ধরা পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ, ঢাকা
প্রতিবেদকের নাম 



















