ঢাকা ১২:২৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬, ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বিজ্ঞাপন:
📰 Dainikbishawsongbad.com— দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ খবর, ব্রেকিং নিউজ, রাজনীতি, খেলাধুলা, বিনোদন, আন্তর্জাতিক সংবাদ ও গুরুত্বপূর্ণ সকল আপডেট পেতে প্রতিদিন ভিজিট করুন 🌍 নির্ভরযোগ্য ও দ্রুত সংবাদ পরিবেশনে আমরা সবসময় আপনার পাশে। 📢 আপনার ব্যবসা বা প্রতিষ্ঠানের প্রচারের জন্য ব্যানার বিজ্ঞাপন ও স্পন্সর পোস্ট সুবিধা রয়েছে। 🌐 DainikBishwaSongbad.com

রং-তুলি নয়, ঘুণের গুঁড়াতেই জীবনের ছবি আঁকেন ‘ঘুণশিল্পী’ ইকবাল

 

ঘুণে কাটা কাঠের গুঁড়া—যা সাধারণত সবাই ফেলে দেন, সেই মূল্যহীন উপকরণই শিল্পের অনন্য মাধ্যম হয়ে উঠেছে ময়মনসিংহের ইকবাল হোসেনের হাতে। রং-তুলি কিংবা দামি ক্যানভাস নয়, শুধু কাঠের গুঁড়া, আঠা আর অসীম ধৈর্য দিয়েই তিনি সৃষ্টি করছেন নান্দনিক সব শিল্পকর্ম। এই ব্যতিক্রমী কাজের কারণেই তিনি এখন পরিচিত ‘ঘুণশিল্পী’ ইকবাল নামে।

ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইল মহাসড়কের পাশে কাঁচিঝুলিতে ছোট্ট একটি নার্সারিই তার কর্মশালা। বাইরে থেকে সাধারণ গাছের দোকান মনে হলেও ভেতরে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে ভিন্ন এক শিল্পজগৎ। সেখানে ফুটে ওঠে জাতীয় ব্যক্তিত্ব, প্রকৃতির মনোমুগ্ধকর দৃশ্য এবং নানা প্রতিকৃতি।

যেভাবে শুরু

ইকবাল হোসেন (৪৬) জানান, অভাব-অনটনের কারণে অষ্টম শ্রেণির পর আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। জীবিকার তাগিদে ওয়ালম্যাট তৈরির কাজ শিখেছিলেন। ১৯৯৮ সালে এক বন্ধুর বাড়িতে ঘুণে ধরা কাঠের গুঁড়া দেখে তার মনে প্রশ্ন জাগে—এই গুঁড়া দিয়েও কি শিল্প তৈরি সম্ভব?

আরও পড়ুনঃ  হামলার নির্দেশ দেন ওবায়দুল কাদের, ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হলো কল রেকর্ড

সেই কৌতূহল থেকেই শুরু হয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা। দীর্ঘ চেষ্টার পর আঠা ও কাঠের গুঁড়ার সমন্বয়ে তৈরি করেন প্রথম শিল্পকর্ম। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

যেভাবে তৈরি হয় শিল্পকর্ম

বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়ি থেকে সংগ্রহ করা ঘুণে কাটা কাঠের গুঁড়া প্রথমে চালুনি দিয়ে পরিষ্কার করা হয়। এরপর বোর্ডের ওপর কালো কাপড় লাগিয়ে ক্যানভাস তৈরি করা হয়। পেন্সিল দিয়ে নকশা এঁকে প্রয়োজনীয় স্থানে আঠা লাগিয়ে তার ওপর ছড়িয়ে দেওয়া হয় কাঠের গুঁড়া। শুকিয়ে গেলে ধীরে ধীরে ফুটে ওঠে শিল্পকর্মের আসল রূপ।

ইকবাল জানান, মেহগনি, কাঁঠাল ও কড়ই কাঠের গুঁড়া সবচেয়ে ভালো ফল দেয়। বিভিন্ন রঙের কাঠের গুঁড়া ব্যবহার করে ছবিতে আলোর ছায়া ও গভীরতা তৈরি করা হয়।

সময় ও মূল্য

একটি মানুষের প্রতিকৃতি তৈরি করতে সময় লাগে ১৫ থেকে ২০ দিন। আর প্রাকৃতিক দৃশ্যের ছবি তৈরি করা যায় এক থেকে দুই দিনে

আরও পড়ুনঃ  ২০৮ দিন সমুদ্রে মার্কিন রণতরি, স্বজনদের ক্ষোভে জবাবদিহির মুখে নৌবাহিনী

তার শিল্পকর্মের মূল্য—

  • ছোট ওয়ালম্যাট: ৩০০ টাকা
  • মাঝারি শিল্পকর্ম: ১,৫০০–৫,০০০ টাকা
  • প্রতিকৃতি: ৮,০০০–১০,০০০ টাকা

দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও

২০০০ সালে প্রথমবার নিজের শিল্পকর্ম নিয়ে প্রদর্শনীর আয়োজন করেন ইকবাল। এরপর ময়মনসিংহের বিভিন্ন প্রদর্শনীতে অংশ নেন। তার তৈরি শিল্পকর্ম ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, নেদারল্যান্ডস, নিউজিল্যান্ড ও কেনিয়াসহ বিভিন্ন দেশে পৌঁছেছে।

বর্তমানে নার্সারি ও শিল্পকর্ম বিক্রির আয়েই স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে স্বচ্ছন্দে সংসার চালাচ্ছেন তিনি।

ভবিষ্যৎ স্বপ্ন

ইকবাল হোসেন বলেন,

“চিত্রকর্ম বিক্রির অর্থ দিয়ে সুবিধাবঞ্চিত ও পথশিশুদের জন্য একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে চাই। পাশাপাশি নিজের একটি আর্ট গ্যালারি প্রতিষ্ঠারও স্বপ্ন দেখি।”

স্থানীয়দের চোখে ইকবাল

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল হালিম বলেন, শুরুতে অনেকেই তার কাজকে গুরুত্ব দেননি। এখন দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ তার শিল্পকর্ম দেখতে আসেন।

আরও পড়ুনঃ  ১৭ বছর পরও চাকরি স্থায়ীকরণের অনিশ্চয়তা, ব্রেন স্ট্রোকে নির্বাচন অফিসকর্মীর মৃত্যু

ব্যবসায়ী শাহীন মিয়া বলেন, “ঘুণের গুঁড়া দিয়ে এত সুন্দর শিল্পকর্ম তৈরি করা সম্ভব—ইকবাল ভাইকে না দেখলে বিশ্বাসই করতাম না।”

ক্রেতা সুমাইয়া রহমান জানান, তার কাছ থেকে কেনা ওয়ালম্যাট ঘরের সৌন্দর্য বাড়িয়েছে।

বিশেষজ্ঞের মূল্যায়ন

ময়মনসিংহ বিভাগীয় চারুশিল্পী পরিষদের সভাপতি মো. রাজন বলেন, একাডেমিক প্রশিক্ষণ না থাকলেও ইকবালের নিষ্ঠা ও নিয়মিত চর্চা তাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ঘুণের গুঁড়া দিয়ে শিল্পচর্চা লোকশিল্পের একটি ব্যতিক্রমী ধারা, যা সংরক্ষণ ও পৃষ্ঠপোষকতার দাবি রাখে।

মূল্যহীন থেকে মূল্যবান

যে ঘুণে কাটা কাঠের গুঁড়াকে মানুষ সাধারণত আবর্জনা মনে করে ফেলে দেয়, সেই উপকরণ দিয়েই নিজের সৃজনশীলতা ও শ্রমে অনন্য শিল্পভুবন গড়ে তুলেছেন ইকবাল হোসেন। তার এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ শুধু ময়মনসিংহ নয়, দেশের লোকশিল্পের ভাণ্ডারেও যুক্ত করেছে এক নতুন অধ্যায়।

T ag

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় পোস্ট

রং-তুলি নয়, ঘুণের গুঁড়াতেই জীবনের ছবি আঁকেন ‘ঘুণশিল্পী’ ইকবাল

আপডেটের সময়: ০৫:৩৯:১৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

 

ঘুণে কাটা কাঠের গুঁড়া—যা সাধারণত সবাই ফেলে দেন, সেই মূল্যহীন উপকরণই শিল্পের অনন্য মাধ্যম হয়ে উঠেছে ময়মনসিংহের ইকবাল হোসেনের হাতে। রং-তুলি কিংবা দামি ক্যানভাস নয়, শুধু কাঠের গুঁড়া, আঠা আর অসীম ধৈর্য দিয়েই তিনি সৃষ্টি করছেন নান্দনিক সব শিল্পকর্ম। এই ব্যতিক্রমী কাজের কারণেই তিনি এখন পরিচিত ‘ঘুণশিল্পী’ ইকবাল নামে।

ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইল মহাসড়কের পাশে কাঁচিঝুলিতে ছোট্ট একটি নার্সারিই তার কর্মশালা। বাইরে থেকে সাধারণ গাছের দোকান মনে হলেও ভেতরে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে ভিন্ন এক শিল্পজগৎ। সেখানে ফুটে ওঠে জাতীয় ব্যক্তিত্ব, প্রকৃতির মনোমুগ্ধকর দৃশ্য এবং নানা প্রতিকৃতি।

যেভাবে শুরু

ইকবাল হোসেন (৪৬) জানান, অভাব-অনটনের কারণে অষ্টম শ্রেণির পর আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। জীবিকার তাগিদে ওয়ালম্যাট তৈরির কাজ শিখেছিলেন। ১৯৯৮ সালে এক বন্ধুর বাড়িতে ঘুণে ধরা কাঠের গুঁড়া দেখে তার মনে প্রশ্ন জাগে—এই গুঁড়া দিয়েও কি শিল্প তৈরি সম্ভব?

আরও পড়ুনঃ  বিদেশি সংবাদমাধ্যমের ওপর নতুন বিধিনিষেধ, সমালোচনার মুখে পাকিস্তান

সেই কৌতূহল থেকেই শুরু হয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা। দীর্ঘ চেষ্টার পর আঠা ও কাঠের গুঁড়ার সমন্বয়ে তৈরি করেন প্রথম শিল্পকর্ম। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

যেভাবে তৈরি হয় শিল্পকর্ম

বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়ি থেকে সংগ্রহ করা ঘুণে কাটা কাঠের গুঁড়া প্রথমে চালুনি দিয়ে পরিষ্কার করা হয়। এরপর বোর্ডের ওপর কালো কাপড় লাগিয়ে ক্যানভাস তৈরি করা হয়। পেন্সিল দিয়ে নকশা এঁকে প্রয়োজনীয় স্থানে আঠা লাগিয়ে তার ওপর ছড়িয়ে দেওয়া হয় কাঠের গুঁড়া। শুকিয়ে গেলে ধীরে ধীরে ফুটে ওঠে শিল্পকর্মের আসল রূপ।

ইকবাল জানান, মেহগনি, কাঁঠাল ও কড়ই কাঠের গুঁড়া সবচেয়ে ভালো ফল দেয়। বিভিন্ন রঙের কাঠের গুঁড়া ব্যবহার করে ছবিতে আলোর ছায়া ও গভীরতা তৈরি করা হয়।

সময় ও মূল্য

একটি মানুষের প্রতিকৃতি তৈরি করতে সময় লাগে ১৫ থেকে ২০ দিন। আর প্রাকৃতিক দৃশ্যের ছবি তৈরি করা যায় এক থেকে দুই দিনে

আরও পড়ুনঃ  শেকৃবিতে ‘পুলিশ’ পরিচয়ে সাইবার প্রতারণা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ

তার শিল্পকর্মের মূল্য—

  • ছোট ওয়ালম্যাট: ৩০০ টাকা
  • মাঝারি শিল্পকর্ম: ১,৫০০–৫,০০০ টাকা
  • প্রতিকৃতি: ৮,০০০–১০,০০০ টাকা

দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও

২০০০ সালে প্রথমবার নিজের শিল্পকর্ম নিয়ে প্রদর্শনীর আয়োজন করেন ইকবাল। এরপর ময়মনসিংহের বিভিন্ন প্রদর্শনীতে অংশ নেন। তার তৈরি শিল্পকর্ম ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, নেদারল্যান্ডস, নিউজিল্যান্ড ও কেনিয়াসহ বিভিন্ন দেশে পৌঁছেছে।

বর্তমানে নার্সারি ও শিল্পকর্ম বিক্রির আয়েই স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে স্বচ্ছন্দে সংসার চালাচ্ছেন তিনি।

ভবিষ্যৎ স্বপ্ন

ইকবাল হোসেন বলেন,

“চিত্রকর্ম বিক্রির অর্থ দিয়ে সুবিধাবঞ্চিত ও পথশিশুদের জন্য একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে চাই। পাশাপাশি নিজের একটি আর্ট গ্যালারি প্রতিষ্ঠারও স্বপ্ন দেখি।”

স্থানীয়দের চোখে ইকবাল

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল হালিম বলেন, শুরুতে অনেকেই তার কাজকে গুরুত্ব দেননি। এখন দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ তার শিল্পকর্ম দেখতে আসেন।

আরও পড়ুনঃ  জুয়া আয়োজনের অভিযোগে দুদকের অনুসন্ধানে সাবেক এমপি শিমুলসহ ২ জন

ব্যবসায়ী শাহীন মিয়া বলেন, “ঘুণের গুঁড়া দিয়ে এত সুন্দর শিল্পকর্ম তৈরি করা সম্ভব—ইকবাল ভাইকে না দেখলে বিশ্বাসই করতাম না।”

ক্রেতা সুমাইয়া রহমান জানান, তার কাছ থেকে কেনা ওয়ালম্যাট ঘরের সৌন্দর্য বাড়িয়েছে।

বিশেষজ্ঞের মূল্যায়ন

ময়মনসিংহ বিভাগীয় চারুশিল্পী পরিষদের সভাপতি মো. রাজন বলেন, একাডেমিক প্রশিক্ষণ না থাকলেও ইকবালের নিষ্ঠা ও নিয়মিত চর্চা তাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ঘুণের গুঁড়া দিয়ে শিল্পচর্চা লোকশিল্পের একটি ব্যতিক্রমী ধারা, যা সংরক্ষণ ও পৃষ্ঠপোষকতার দাবি রাখে।

মূল্যহীন থেকে মূল্যবান

যে ঘুণে কাটা কাঠের গুঁড়াকে মানুষ সাধারণত আবর্জনা মনে করে ফেলে দেয়, সেই উপকরণ দিয়েই নিজের সৃজনশীলতা ও শ্রমে অনন্য শিল্পভুবন গড়ে তুলেছেন ইকবাল হোসেন। তার এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ শুধু ময়মনসিংহ নয়, দেশের লোকশিল্পের ভাণ্ডারেও যুক্ত করেছে এক নতুন অধ্যায়।