ঢাকার অদূরের সাভার-আশুলিয়ায় একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে। চলতি বছরের বিভিন্ন সময়ে ব্যক্তিগত বিরোধ, পারিবারিক কলহ, ছিনতাই, পূর্বশত্রুতা থেকে শুরু করে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করেও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।
কোথাও বসতঘর থেকে মরদেহ উদ্ধার হয়েছে, আবার কোথাও সড়ক কিংবা নির্জন স্থানে মিলেছে লাশ। কোনো কোনো ঘটনায় দ্রুত রহস্য উদ্ঘাটন করে আসামি গ্রেপ্তার করা হলেও বেশ কিছু ঘটনায় হত্যার কারণ ও জড়িতদের ভূমিকা এখনো তদন্তাধীন।
এর মধ্যেই সর্বশেষ আমিনবাজারে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আলতাফ হোসেনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় সাভার-আশুলিয়ার অপরাধ পরিস্থিতি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
গাড়ি রাখা নিয়ে বিরোধ, প্রাণ গেল এসআইয়ের
গত শনিবার রাতে আমিনবাজারের বড়দেশি এলাকায় এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। ৫৮ বছর বয়সী আলতাফ হোসেন ঢাকার মালিবাগে এসবির কার্যালয়ে কর্মরত ছিলেন। স্থানীয় একটি বিরোধের প্রতিবাদ করতে গিয়ে তিনি হামলার শিকার হন। এ সময় তার ছেলে আরিফুল ইসলামও আহত হন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, বড়দেশি মদিনা হাউজিং এলাকায় একটি গেঞ্জি কারখানার সামনে গাড়ি রাখা এবং এক অটোরিকশাচালককে মারধরকে কেন্দ্র করে বিরোধের সূত্রপাত হয়।
বিষয়টি থামাতে এগিয়ে গেলে কয়েকজনের সঙ্গে আলতাফ হোসেনের কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে তাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়।
দ্বিতীয় দফায় হামলা, ছেলেকেও মারধর
হামলাকারীরা একপর্যায়ে আলতাফের পিছু নিয়ে তার কারখানার দিকে যায়। সেখানে তার ওপর আবার হামলা চালানো হয়। ছেলে আরিফুল ইসলাম বাবাকে রক্ষা করতে এগিয়ে গেলে তিনিও হামলার শিকার হন।
পরে স্থানীয়রা বাবা-ছেলেকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আলতাফ হোসেনের মৃত্যু হয়।
ঘটনার পর আমিনবাজার এলাকা থেকে জহিরুল ইসলাম নামে একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পুলিশ জানিয়েছে, তিনি একটি প্রাইভেটকারের চালক ও মালিক।
এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী মামলা করেছেন। মামলায় ১৫ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও ১৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
ছায়া তদন্তে পিবিআই
ঘটনাটির ছায়া তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। হামলার সূত্রপাত কীভাবে, দ্বিতীয় দফায় কারা হামলা চালায়, ঘটনাস্থলে কারা উপস্থিত ছিল এবং প্রত্যেকের ভূমিকা কী ছিল—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্তে সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, মোবাইল ফোনের তথ্যসহ বিভিন্ন আলামতকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। গ্রেপ্তার জহিরুল ইসলামকে জিজ্ঞাসাবাদ করেও হামলায় অংশ নেওয়া অন্যদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
বছরজুড়েই হত্যার নানা ঘটনা
সাভার-আশুলিয়ায় চলতি বছরের আগের ঘটনাগুলোতেও হত্যার বিভিন্ন ধরন সামনে এসেছে। জানুয়ারিতে সাভারে ভবঘুরের ছদ্মবেশে থাকা মশিউর রহমান ওরফে সম্রাটের বিরুদ্ধে ছয়জনকে হত্যার অভিযোগ প্রকাশ্যে আসে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ঘটনায় এক বৃদ্ধা, এক নারী ও এক কিশোরীসহ ছয়জন নিহত হন। পরে সম্রাট আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
মে মাসে আশুলিয়ায় একই পরিবারের দুই ভাইকে গুলি করার ঘটনা ঘটে। এর আগে স্ত্রীকে গলা কেটে হত্যার ঘটনায় আদালতে মৃত্যুদণ্ডের রায়ও হয়েছে।
জুন ও জুলাইয়েও আশুলিয়া ও সাভারে একাধিক হত্যাকাণ্ডের খবর আসে। জুলাইয়ে পিবিআই একটি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে আসামি গ্রেপ্তার করে। আগস্টেও সাভার-আশুলিয়া এলাকায় হত্যার অভিযোগে একাধিক মামলা ও তদন্তের খবর প্রকাশিত হয়।
আগস্টের অন্যতম আলোচিত ঘটনায় একটি তালাবদ্ধ কক্ষ থেকে গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে পিবিআই তদন্ত করে ওই ঘটনায় আসামি শনাক্তের কথা জানায়।
প্রতিটি ঘটনা আলাদাভাবে তদন্তের দাবি পুলিশের
ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার শামীমা পারভীনের বক্তব্য অনুযায়ী, আমিনবাজারের সর্বশেষ ঘটনায় একটি প্রাইভেটকার রাখা নিয়ে বিরোধ মেটাতে গিয়ে এসআই আলতাফ ও তার ছেলে হামলার শিকার হন। ঘটনার পর পুলিশ দ্রুত অভিযান চালিয়ে একজনকে আটক করেছে এবং অন্যদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
সাভার মডেল থানার ওসি মো. সাইফুল আলম জানান, আলতাফ হত্যার ঘটনায় একজনকে আটক করা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদেরও আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি ঢাকা জেলা পিবিআই ছায়া তদন্ত শুরু করেছে।
পিবিআইয়ের ঢাকা জেলা ওসি সোলেমান গাজী জানিয়েছেন, ঘটনার পরপরই তারা ছায়া তদন্তে কাজ শুরু করেছেন।
আশুলিয়ায় দম্পতি হত্যার ঘটনায়ও পুলিশ তদন্ত চালাচ্ছে। আশুলিয়া থানার ওসি মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, মামলার পর ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। নিহতদের স্বজন ও আশপাশের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে ঘটনার সূত্র খোঁজা হচ্ছে।
শিল্পাঞ্চলে বাড়ছে নিরাপত্তার চাপ
সাভার-আশুলিয়া দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পাঞ্চল। বিপুলসংখ্যক শ্রমজীবী মানুষের বসবাস, দ্রুত নগরায়ণ, আবাসিক এলাকার বিস্তার এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের আগমনে এ এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক এলাকায় রাতের বেলায় পর্যাপ্ত টহল ও নজরদারি না থাকায় অপরাধীরা সুযোগ পায়।
বিশেষ করে আমিনবাজার, বড়দেশি, মদিনা হাউজিং, জামগড়া, বাইপাইল ও আশপাশের আবাসিক এলাকাগুলোতে জনসংখ্যা বাড়লেও সব এলাকায় সমানভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এ অবস্থায় শুধু অপরাধের পর আসামি গ্রেপ্তার নয়, অপরাধ প্রতিরোধে আগাম গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো, নিয়মিত টহল জোরদার এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরার সংখ্যা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
প্রতিবেদকের নাম 




















