জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর সরকার গণপরিবহনের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ১৭ পয়সা বাড়ালেও রাজধানীর বিভিন্ন রুটে এর চেয়ে বেশি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কোথাও ৩০ টাকার ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ৪০ টাকা, আবার কোনো কোনো রুটে যাত্রীভেদে একই দূরত্বের জন্য ৫ থেকে ১০ টাকা বেশি দাবি করা হচ্ছে।
সরকার নতুন ভাড়ার তালিকা প্রকাশ করলেও রাজধানীর অধিকাংশ বাসে তা এখনো টাঙানো হয়নি। কোনো কোনো বাসে পুরোনো তালিকা ঝুলতে দেখা গেছে। ফলে প্রকৃত ভাড়া নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে চালক ও হেলপারদের বাগ্বিতণ্ডার ঘটনাও ঘটছে।
গুলিস্তান, পল্টন, রামপুরা, বাড্ডা, শাহবাগ, কারওয়ান বাজার ও গাবতলী এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ বাসে নতুন ভাড়ার চার্ট নেই। আবার কিছু বাসে চার্ট থাকলেও সেটি পুরোনো। এর মধ্যেই নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি টাকা নেওয়ার অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা।
সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মহানগর এলাকায় বাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ২ টাকা ৫৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ৭০ পয়সা করা হয়েছে। অর্থাৎ ভাড়া বেড়েছে ১৭ পয়সা বা ৬ দশমিক ৭২ শতাংশ।
তবে গাবতলী থেকে গুলিস্তানগামী বসুমতি পরিবহনের যাত্রী শাহাদত উল্লাহ জানান, আগে এ পথে ৩০ টাকা ভাড়া দিলেও এখন তার কাছ থেকে ৪০ টাকা নেওয়া হয়েছে। তার অভিযোগ, কম দূরত্বের পথেও কোথাও কোথাও ১০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে।
বনশ্রী থেকে আছিম পরিবহনের একটি বাসে নতুন তো নয়, পুরোনো ভাড়ার তালিকাও পাওয়া যায়নি। বাসটির চালকের সহকারী ইলিয়াস আলী বলেন, মালিকপক্ষ এখনো নতুন চার্ট দেয়নি। তাই আগের ভাড়াই নেওয়া হচ্ছে।
শাহবাগে সাভার পরিবহনের একটি বাসে হেলপার দূরত্ব অনুযায়ী আগের চেয়ে ৫ থেকে ১০ টাকা বেশি দাবি করেন। বাসটির চালক মো. জয়নাল বলেন, ডিজেলের দাম বাড়ায় পরিবহন পরিচালনা ব্যয় বেড়েছে। নতুন ভাড়ার তালিকা মালিকপক্ষ থেকে দেওয়া হবে।
সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি আদায় করলে সংশ্লিষ্ট যাত্রীবাহী পরিবহনের রুট পারমিট স্থায়ীভাবে বাতিলের হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সরেজমিনে দেখা গেছে, অনেক বাসে নতুন তালিকা প্রদর্শন করা হয়নি এবং কোথাও কোথাও তালিকা থাকলেও তা অনুযায়ী ভাড়া নেওয়া হচ্ছে না।
যাত্রীদের অভিযোগ, বাসে ভাড়ার তালিকা না থাকায় প্রকৃত ভাড়া জানা কঠিন হয়ে পড়েছে। একই রুটে একেক বাসে এমনকি একই বাসে যাত্রীভেদেও ভিন্ন ভাড়া নেওয়ার ঘটনা ঘটছে।
সাইনবোর্ড থেকে আসা লাব্বাইক পরিবহনের একটি বাসে চালকের আসনের ওপরে পুরোনো ভাড়ার তালিকা ঝুলতে দেখা যায়। ওই বাসের যাত্রী দীপেন ঘোষ জানান, সকালে গাবতলী থেকে একই পথে ৩০ টাকা ভাড়া দিয়ে এলেও ফেরার সময় তার কাছ থেকে ৪০ টাকা নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, বাসে ভাড়ার তালিকা না থাকায় যাত্রীদের পাশাপাশি চালক ও ভাড়া আদায়কারীদেরও প্রকৃত ভাড়া জানতে সমস্যা হচ্ছে। তার দাবি, সরকারি নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বাস্তবে বেশি টাকা নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, দ্রুত বাস মালিকদের কাছে নতুন ভাড়ার তালিকা পৌঁছে দিয়ে প্রতিটি বাসে তা প্রদর্শন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। নতুন তালিকা না টাঙানোর বিষয়ে বিআরটিএর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ অনুযায়ী, গণপরিবহনে সহজে দৃশ্যমান স্থানে ভাড়ার তালিকা প্রদর্শন বাধ্যতামূলক। আইনের ৩৪ ধারায় এ বিধান রয়েছে। তা না মানলে অনধিক এক মাসের কারাদণ্ড, অনধিক ১০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে। চালকের ক্ষেত্রে অতিরিক্তভাবে এক দোষসূচক পয়েন্ট কাটার বিধানও রয়েছে।
এর আগে ২০ সেপ্টেম্বর জ্বালানি তেলের দাম লিটারে সর্বোচ্চ ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়। এতে ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫, পেট্রোল ১৪০ থেকে ১৬০ এবং অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা হয়েছে।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর পরিবহন মালিকদের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে ২২ সেপ্টেম্বর মহানগর এলাকায় কিলোমিটারপ্রতি ১৭ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে বাসে নতুন ভাড়ার তালিকা প্রদর্শন না করায় নির্ধারিত ভাড়া বাস্তবে আদায় হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
প্রতিবেদকের নাম 




















