লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালের চিকিৎসাসেবায় জনবল সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। ১০০ শয্যার এই হাসপাতালে চিকিৎসকসহ ১৮৮টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ১০১ জন। শূন্য রয়েছে ৮৭টি পদ। এর মধ্যে ৫৭ জন চিকিৎসকের পদ থাকলেও কর্মরত আছেন মাত্র ১৮ জন।
অন্যদিকে প্রতিদিন হাসপাতালে ভর্তি থাকেন প্রায় ৩৫০ থেকে ৪০০ রোগী। ফলে সীমিতসংখ্যক চিকিৎসক, নার্স ও সেবাদানকারী কর্মীকে বিপুলসংখ্যক রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
এক শয্যায় ৩-৪ রোগী
সরেজমিনে দেখা গেছে, সকাল থেকেই বহির্বিভাগের টিকিট কাউন্টারে রোগীদের ভিড়। জরুরি বিভাগেও ছিল রোগীর চাপ। ডায়রিয়া, হাম ও ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্তদের সংখ্যা বাড়ায় ওয়ার্ডগুলোতেও তৈরি হয়েছে চাপ।
শয্যার সংকট এতটাই প্রকট যে অনেক ক্ষেত্রে এক বিছানায় তিন থেকে চারজন রোগীকে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। পুরুষ, নারী, শিশু ও ডায়রিয়া ওয়ার্ডের পাশাপাশি বারান্দা ও মেঝেতেও অতিরিক্ত বিছানা দিয়ে রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
চিকিৎসকের ৫৭ পদের ৩৯টিই শূন্য
হাসপাতালে চিকিৎসক থাকার কথা ৫৭ জন। বর্তমানে আছেন মাত্র ১৮ জন। সিনিয়র কনসালটেন্ট গাইনি, মেডিসিন ও ইএনটি এবং জুনিয়র কনসালটেন্ট সার্জারি, চক্ষু ও ইএনটিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে ৩৯টি পদ শূন্য রয়েছে।
এতে দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা দিতে সমস্যা হচ্ছে। চিকিৎসকের পাশাপাশি নার্স ও অন্যান্য সেবাদানকারী কর্মীর সংকটেও সেবা ব্যাহত হচ্ছে।
২৩ বছরেও পূরণ হয়নি প্রয়োজনীয় জনবল
লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালটি শুরুতে ডিসপেনসারি হিসেবে যাত্রা করে। ১৯৭২ সালে এটি ৩১ শয্যায় উন্নীত হয়। ১৯৮৪ সালে লক্ষ্মীপুর জেলা হওয়ার পর হাসপাতালটি ৫০ শয্যায় এবং ২০০৩ সালে ১০০ শয্যায় উন্নীত করা হয়।
১০০ শয্যায় উন্নীত হওয়ার প্রায় ২৩ বছর পার হলেও এখনো নির্ধারিত জনবল নিয়োগ হয়নি। এমনকি ৫০ শয্যার জন্য প্রয়োজনীয় জনবলের চেয়েও কম জনবল নিয়ে হাসপাতালটির কার্যক্রম চলছে।
২০১৭ সালের ১৪ মার্চ হাসপাতালটি ২৫০ শয্যায় উন্নীত করার ঘোষণা দেওয়া হয়। পরের বছর জুনে ১৫০ শয্যার আটতলা ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়। তবে আট বছর দুই মাস পেরিয়ে গেলেও ভবনটির নির্মাণকাজ শেষ হয়নি।
নতুন ভবন দ্রুত চালুর নির্দেশ
শনিবার পানিসম্পদমন্ত্রী ও লক্ষ্মীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি রোগী, স্বজন ও চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলেন।
তিনি দ্রুত ১৫০ শয্যার নতুন ভবনের নির্মাণকাজ শেষ করে আগামী মার্চের মধ্যে উদ্বোধনের জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেন।
‘প্রতিদিন ৪০-৫০ রোগী ভর্তি হচ্ছে’
সদর হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার জহুরুল ইসলাম রনি বলেন, ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে হাম, টাইফয়েডসহ বিভিন্ন রোগ বাড়ছে। এসব রোগ প্রতিরোধে কোভিডের সময়ের মতো সচেতনতা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা প্রয়োজন।
তিনি জানান, প্রতিদিন হাসপাতালে নতুন করে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জন রোগী ভর্তি হচ্ছেন। ফলে চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে চিকিৎসকদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।
সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) অরুপ পাল বলেন, ১০০ শয্যার হাসপাতালে প্রতিদিন ৩৫০ থেকে ৪০০ রোগী ভর্তি থাকেন। এই বিপুলসংখ্যক রোগীকে চিকিৎসা দিতে চিকিৎসক, নার্স ও সেবাদানকারী কর্মীদের অতিরিক্ত চাপের মধ্যে কাজ করতে হচ্ছে।
তার আশা, ২৫০ শয্যার হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে রোগীর চাপ এবং চিকিৎসকসহ জনবল সংকট অনেকটাই কমবে।
ওষুধ নিয়ে স্বজনদের অভিযোগ
রোগীদের কয়েকজন স্বজন অভিযোগ করেছেন, হাসপাতাল থেকে পর্যাপ্ত ওষুধ ও ইনজেকশন পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে বেশিরভাগ ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে।
বাঙ্গাখাঁ এলাকার দোলন আক্তার জানান, তার সন্তান হাম আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। কিন্তু এক বিছানায় তিনজন রোগী থাকায় শিশুকে নিয়ে হাসপাতালে অবস্থান করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই তিনি শিশুটিকে নিয়ে বাসা ও হাসপাতালের মধ্যে যাতায়াত করছেন।
কুশাখালীর ঝাউডগি গ্রামের হাজেরা বেগম জানান, চার দিন ধরে হাম আক্রান্ত নাতিকে নিয়ে হাসপাতালে আছেন। তার অভিযোগ, বেশিরভাগ ওষুধই বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে।
‘পর্যাপ্ত ওষুধ আছে, রেশনিং করে দেওয়া হচ্ছে’
লক্ষ্মীপুর জেলা সিভিল সার্জন বাহারুল আলম বলেন, বহির্বিভাগে প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার রোগীকে সেবা দিতে হচ্ছে। হাসপাতালে পর্যাপ্ত ওষুধ রয়েছে। তবে সব রোগীকে ওষুধ নিশ্চিত করতে প্রয়োজন অনুযায়ী রেশনিং করে তা দেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, হাসপাতালে ডেঙ্গু, হাম ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগী রয়েছে। একই সঙ্গে হাম প্রতিরোধে সবাইকে টিকা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
প্রতিবেদকের নাম 




















