দীর্ঘ ৩৫ বছর পর আজ বৃহস্পতিবার আবারও সরাসরি ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হতে যাচ্ছে বাংলাদেশে। ১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবরের পর এবারই প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। জাতীয় সংসদ ভবনের সংসদকক্ষে দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সংসদ সদস্যদের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ভোট শেষে সেখানেই ফল ঘোষণা করবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ‘নির্বাচনি কর্তা’ এ এম এম নাসির উদ্দিন।
এবারের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছেন সংসদের প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের মনোনীত লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। সংসদে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বর্তমান সংসদে ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসনসহ মোট সদস্য সংখ্যা ৩৪৯। একটি আসনের গেজেট প্রকাশ না হওয়ায় ভোটের জন্য ৩৪৯টি ব্যালট প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ভোটগ্রহণের জন্য সংসদকক্ষে তিনটি ব্যালট বাক্স থাকবে। তবে মালয়েশিয়ায় চিকিৎসাধীন বিএনপির সংসদ সদস্য মির্জা আব্বাস ভোট দিতে পারবেন কি না, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
ভোটগ্রহণ শেষে আজই ফলাফল ঘোষণা করার কথা রয়েছে। এরপর নির্বাচন কমিশন গেজেট প্রকাশ করবে। আগামীকাল শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বঙ্গভবনের দরবার হলে নতুন রাষ্ট্রপতির শপথ অনুষ্ঠিত হবে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঐতিহাসিক হিসেবে উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান। বুধবার বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় তিনি বলেন, দীর্ঘ সংগ্রাম ও অনেক মূল্য দেওয়ার পর দেশের মানুষ আবার এমন একটি নির্বাচনের সুযোগ পেয়েছে।
সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, ৩৫ বছর পর দেশের মানুষ আবারও প্রত্যক্ষ করবে ভোটের মাধ্যমে কীভাবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তাঁর মতে, এই নির্বাচন দেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনও এবারের নির্বাচনকে ঐতিহাসিক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় পর প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হওয়ায় এ নির্বাচন বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে দীর্ঘ বিরতির কারণে প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা সীমিত থাকলেও প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর গত সাতটি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। ওই বছরের ৮ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের প্রার্থী সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী পেয়েছিলেন ৯২ ভোট। এরপর আর প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়নি।
এবারের নির্বাচনে সংসদ সদস্যরাই ভোটার। ফলে রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিজেও ভোট দিতে পারবেন। অন্যদিকে অলি আহমদ সংসদ সদস্য না হওয়ায় ভোট দিতে পারবেন না। রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মির্জা ফখরুলের সংসদ সদস্য পদও শূন্য হবে।
বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে আবেগঘন বক্তব্য দেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বক্তব্যের একপর্যায়ে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। দলের প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, দলের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।
দলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের কথা উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, দায়িত্ব পালনকালে কোনো ভুল হয়ে থাকলে বা অজান্তে কারও মনে আঘাত দিয়ে থাকলে তিনি ক্ষমাপ্রার্থী। দল তাঁকে যে সম্মান ও দায়িত্ব দিয়েছে, তা জীবন দিয়ে হলেও রক্ষা করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি। একই সঙ্গে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো আপস না করার কথাও জানান।
বঙ্গভবনে দায়িত্ব নেওয়ার পর সহকর্মীদের মিস করবেন উল্লেখ করে দলের নেতাকর্মীদের কাছে দোয়া চান মির্জা ফখরুল। তাঁর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
এদিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সুষ্ঠু ও স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন। তিনি জানান, রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার ও বিরোধীদলীয় নেতার ভোট দেওয়ার দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। ভোট গণনার সময়ও সরাসরি সম্প্রচার চালু থাকবে।
তবে ফলাফল ঘোষণার সময় কোনো সংসদ সদস্য কোন প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন, তা প্রকাশ করা হবে না। ব্যালটে ভোটারের নাম ও প্রার্থীদের নাম থাকবে। সংসদকক্ষে ভোটগ্রহণ চলাকালে কোনো ধরনের প্রচারণা চালানো যাবে না বলেও জানিয়েছেন সিইসি।
এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট গণনা থেকে ফলাফল ঘোষণা পর্যন্ত বাংলাদেশ টেলিভিশন ও সংসদ টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। ফলে ৩৫ বছর পর অনুষ্ঠিতব্য এই নির্বাচনের পুরো প্রক্রিয়া সরাসরি দেখার সুযোগ পাবেন দেশের মানুষ।
প্রতিবেদকের নাম 




















