চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়লেও নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে তুলনামূলক ধীরগতিতে। এমন পরিস্থিতিতে চাকরি খোঁজার পরিবর্তে চাকরি দেওয়ার মতো তরুণ উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ভালো ব্যবসায়িক ধারণা থাকলেও পুঁজির অভাবে যারা উদ্যোগ শুরু করতে পারছেন না, তাদের জন্য চালু হতে যাচ্ছে ‘উদ্যোগ’ প্রকল্প।
এই প্রকল্পের আওতায় শুরুতে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা ঋণ দেওয়া হবে। উদ্যোক্তা ঋণের অর্থ নির্ধারিত কাজে ব্যবহার করে মূল টাকা সময়মতো ফেরত দিতে পারলে পরবর্তী সময়ে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা এককালীন অনুদান পাবেন। অর্থাৎ সফল উদ্যোক্তার জন্য ঋণ ও অনুদান মিলিয়ে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হবে।
প্রথম ধাপে ৮ জেলায় ৫ হাজার তরুণ
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর ‘উদ্যোগ’ প্রকল্পের সার্কুলার জারি করা হবে। এরপর বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এক মাস আবেদন গ্রহণ করবে।
পরীক্ষামূলকভাবে প্রথম ধাপে দেশের আট জেলার ৫ হাজার তরুণ উদ্যোক্তাকে এই সহায়তার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। জেলাগুলো হলো—মানিকগঞ্জ, ফেনী, নওগাঁ, ঝিনাইদহ, ভোলা, হবিগঞ্জ, রংপুর ও নেত্রকোনা।
প্রতিটি বিভাগ থেকে একটি করে জেলা বাছাই করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট জেলার ব্যাংক, বিভিন্ন চেম্বার সংগঠন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের মনোনীত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে উদ্যোক্তা নির্বাচন করা হবে। ঋণগ্রহীতার সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৮ বছর।
সফল হলে পর্যায়ক্রমে দেশের ৬৪০ উপজেলায় প্রকল্পটি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
জামানতের চেয়ে গুরুত্ব পাবে ব্যবসার ধারণা
‘উদ্যোগ’ প্রকল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—শুধু জামানত বা প্রচলিত ঋণযোগ্যতার হিসাবের ওপর নির্ভর না করে ব্যবসার ধারণা ও সম্ভাবনাকেও গুরুত্ব দেওয়া হবে।
বাস্তবসম্মত ব্যবসায়িক পরিকল্পনা থাকলেও অর্থের অভাবে যারা উদ্যোগ শুরু করতে পারছেন না, তাদের লক্ষ্য করেই প্রকল্পটি তৈরি করা হচ্ছে।
প্রথম ধাপে পুরো অর্থই ঋণ হিসেবে দেওয়া হবে। উদ্যোক্তা ঋণের অর্থ নির্ধারিত ব্যবসায় ব্যবহার করে সময়মতো মূল টাকা ফেরত দিলে তাকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা অনুদান দেওয়া হবে।
কৃষি থেকে স্টার্টআপ—সব উদ্যোগে সুযোগ
‘উদ্যোগ’ প্রকল্প কেবল প্রচলিত ছোট ব্যবসার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হস্তশিল্প, মৎস্য, পশুপালন, পর্যটন, বিভিন্ন সেবা, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসা ও স্টার্টআপসহ সম্ভাবনাময় বিভিন্ন উদ্যোগকে বিবেচনায় নেওয়া হবে।
ফলে গ্রামাঞ্চলের কৃষিভিত্তিক উদ্যোগের পাশাপাশি শহরের প্রযুক্তিনির্ভর নতুন ব্যবসার ক্ষেত্রেও তরুণদের অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কম সুদের ঋণের সঙ্গে ‘ক্রেডিট প্লাস’
শুধু অর্থায়ন করেই উদ্যোক্তাদের দায়িত্ব শেষ করতে চায় না বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রকল্পে ঋণের পাশাপাশি ‘ক্রেডিট প্লাস’ সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর আওতায় প্রয়োজন অনুযায়ী বাজারজাতকরণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার কথা রয়েছে।
ব্যবসা শুরুর জন্য পুঁজি গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাজার খুঁজে পাওয়া, পণ্য বিক্রি, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ব্যবসা পরিচালনার দক্ষতাও উদ্যোক্তার সাফল্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে সহায়তা পেলে নতুন উদ্যোক্তাদের টিকে থাকার সম্ভাবনা বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
গ্রাহক পর্যায়ে ঋণের সুদের হার সর্বোচ্চ ৪ থেকে ৭ শতাংশ নির্ধারণ করা হতে পারে। প্রকল্পের অর্থায়ন করা হবে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদ্যমান পুনঃঅর্থায়ন তহবিল থেকে।
ঋণ ফেরত দিলেই মিলবে অনুদান
প্রকল্পটির কাঠামোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ঋণ পরিশোধের সঙ্গে অনুদানের যোগসূত্র। শুরুতেই কোনো উদ্যোক্তাকে ২০ লাখ টাকা দেওয়া হবে না।
প্রথমে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ব্যবসা দাঁড় করাতে হবে। সেই অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহার করে মূল ঋণের টাকা ফেরত দেওয়ার পরই মিলবে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা এককালীন অনুদান।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ভাষ্য অনুযায়ী, এতে উদ্যোক্তাদের মধ্যে দায়িত্বশীলতা তৈরি হবে এবং ঋণের অর্থ ফেরত আসার পর তা নতুন উদ্যোক্তাদের অর্থায়নেও ব্যবহার করা সম্ভব হবে।
একজন উদ্যোক্তা থেকে তৈরি হতে পারে ৩-৫ কর্মসংস্থান
প্রকল্পটির লক্ষ্য শুধু তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা নয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাও। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, একটি সফল ক্ষুদ্র উদ্যোগ থেকে গড়ে ৩ থেকে ৫ জনের কর্মসংস্থান হতে পারে।
প্রথম ধাপে ৫ হাজার উদ্যোক্তা সফলভাবে ব্যবসা দাঁড় করাতে পারলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। পরবর্তী সময়ে প্রকল্পটি ৬৪০ উপজেলায় সম্প্রসারণ করা হলে এর কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রভাব আরও বাড়তে পারে।
রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত অর্থায়ন বড় চ্যালেঞ্জ
উপজেলা পর্যায়ে বড় পরিসরে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপের আশঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, অর্থায়ন প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার চেষ্টা করা হবে।
তবে কোনো সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তার রাজনৈতিক পরিচয় থাকলেও তা ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা হবে না। মূল বিবেচনা হবে উদ্যোগের সম্ভাবনা ও আবেদনকারীর যোগ্যতা।
একই সঙ্গে ঋণের অর্থ নির্ধারিত খাতের বাইরে ব্যবহার করলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নই মূল পরীক্ষা
গত ১১ আগস্ট ‘উদ্যোগ’ প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। এরপর প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তুতি আরও এগিয়েছে।
এখন প্রকল্পটির বড় পরীক্ষা হবে মাঠপর্যায়ে। ভালো ব্যবসায়িক ধারণা যাচাই করে প্রকৃত উদ্যোক্তা বাছাই, রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের চাপমুক্ত অর্থায়ন, ঋণের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং সময়মতো ঋণ ফেরত আনা—এসব বিষয়ই প্রকল্পের সাফল্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ ‘উদ্যোগ’ প্রকল্পের সাফল্য শুধু ৫ হাজার তরুণকে ঋণ দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ঋণের অর্থ দিয়ে টেকসই ব্যবসা গড়ে তোলা, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সফল তরুণ উদ্যোক্তা তৈরি করাই হবে প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য।
প্রতিবেদকের নাম 



















