বলিউডের বর্ষীয়ান অভিনেতা নানা পাটেকারের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তার দীর্ঘ অভিনয়জীবনের নানা চরিত্র নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে নতুন প্রজন্মের দর্শকদের কাছে তার পরিচয়ের অন্যতম বড় অংশ হয়ে আছে ২০০৭ সালের সিনেমা ‘ওয়েলকাম’-এর উদয় শেঠি চরিত্র। গম্ভীর ও শক্তিশালী অভিনয়ের জন্য পরিচিত নানা এই সিনেমায় হাস্যরসাত্মক গ্যাংস্টারের ভূমিকায় অভিনয় করে ভিন্ন এক পরিচয় তৈরি করেছিলেন।
‘ওয়েলকাম’ মুক্তি পায় ২০০৭ সালের ২১ ডিসেম্বর। আনিস বাজমি পরিচালিত সিনেমাটিতে নানা পাটেকারের সঙ্গে অভিনয় করেন অক্ষয় কুমার, অনিল কাপুর, ক্যাটরিনা কাইফ ও পরেশ রাওয়াল। ছবিতে নানা অভিনয় করেন দুবাইভিত্তিক গ্যাংস্টার উদয় শেঠির চরিত্রে। তার একমাত্র চিন্তা ছিল বোন সঞ্জনার বিয়ে দেওয়া। কিন্তু অপরাধী পরিবারের সঙ্গে কেউ আত্মীয়তা করতে রাজি না হওয়ায় শুরু হয় নানা ধরনের হাস্যকর পরিস্থিতি।
উদয়ের সহযোগী মজনু ভাইকে নিয়ে তিনি বোনের জন্য পাত্র খুঁজতে থাকেন। পরে রাজীব নামের এক যুবকের সঙ্গে সঞ্জনার সম্পর্ক তৈরি হয়। রাজীবের মামা ড. ঘুংরু শর্ত দেন, উদয় ও মজনুকে অপরাধের জগত ছাড়তে হবে। এরপর দুই গ্যাংস্টারকে অভিনয় ও শিল্পচর্চার দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা শুরু হয়।
ঝুঁকিপূর্ণ চরিত্রে নানা পাটেকার
‘ওয়েলকাম’-এর আগে ‘পরিন্দা’, ‘ক্রান্তিবীর’ ও ‘আব তক ছাপ্পান’-এর মতো সিনেমায় গম্ভীর ও কঠিন চরিত্রে নানা পাটেকারের অভিনয় দর্শকের কাছে আলাদা গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেছিল। সেই অভিনেতাকে এবার কমেডি গ্যাংস্টারের চরিত্রে নেওয়া ছিল পরিচালকের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি।
পরিচালক আনিস বাজমি পরে জানিয়েছিলেন, শুরুতে নানা পাটেকার চিত্রনাট্য শুনতেও আগ্রহী ছিলেন না। বাজমি তাকে তার মায়ের নামে প্রতিশ্রুতি দিয়ে চিত্রনাট্য শোনানোর সুযোগ পান। প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে গল্প শোনানোর পর নানা পাটেকার তাকে জড়িয়ে ধরেন বলে জানান পরিচালক।
চরিত্রটি শেষ পর্যন্ত এতটাই জনপ্রিয় হয় যে নানা পাটেকার ২০০৮ সালের বিভিন্ন পুরস্কারে সেরা কমেডি ও পার্শ্ব অভিনেতার বিভাগে মনোনয়ন পান। যে ধরনের চরিত্রে দর্শক তাকে আগে কল্পনাই করেনি, সেটিই হয়ে ওঠে তার ক্যারিয়ারের স্মরণীয় কাজগুলোর একটি।
গম্ভীর অভিনয়েই তৈরি হয়েছিল হাসি
উদয় শেঠি চরিত্রের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তার গম্ভীরতা। নানা পাটেকার চরিত্রটিকে কখনো সরাসরি হাসির চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করেননি। বরং উদয় নিজেকে সত্যিকারের ভয়ংকর গ্যাংস্টার মনে করে—এমনভাবেই অভিনয় করেছেন। কিন্তু তার চারপাশের পরিস্থিতি ছিল হাস্যকর।
এই বৈপরীত্যই তৈরি করে সিনেমার বড় অংশের হাস্যরস। একদিকে উদয় মানুষের কাছে ভয়ংকর গ্যাংস্টার হিসেবে পরিচিত হতে চায়, অন্যদিকে তার ইচ্ছা ভালোবাসা পাওয়া এবং অভিনেতা হওয়া। অভিনয়ের একটি সাধারণ সংলাপকেও সে এমন আবেগ দিয়ে বলে, যেন সেটি কোনো মহাকাব্যের অংশ।
নানা পাটেকারের কণ্ঠ, চোখের দৃষ্টি, মুখের অভিব্যক্তি এবং সংলাপ বলার ধরন চরিত্রটিকে আরও আলাদা করে তোলে। ‘ওয়েলকাম’-এ তার আগের সিনেমাগুলোর সেই কঠিন উপস্থিতিই কমেডির প্রধান উপাদানে পরিণত হয়।
‘কন্ট্রোল উদয়’ থেকে মিমের জগতে
‘কন্ট্রোল উদয়’—মাত্র দুটি শব্দের এই সংলাপ সিনেমাটির অন্যতম জনপ্রিয় অংশ হয়ে ওঠে। উদয়ের রাগ, নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা এবং নানা পাটেকারের মুখভঙ্গি পরবর্তী সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য মিমের উপকরণ হয়েছে।
‘ভগবান কা দিয়া সব কুছ হ্যায়’সহ সিনেমার আরও কয়েকটি সংলাপও দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। কেউ এগুলো ব্যবহার করেন নিজের সামর্থ্য বা প্রাপ্তি বোঝাতে, আবার কেউ ব্যঙ্গাত্মকভাবে ব্যবহার করেন।
বিশেষ করে রিলস, স্টোরি ও মিমের যুগে ‘কন্ট্রোল উদয়’ নতুন করে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। পুরো সিনেমা না দেখেও একটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতির রাগ, বিরক্তি বা উত্তেজনা বোঝাতে তরুণরা সংলাপটি ব্যবহার করেন।
নতুন প্রজন্মের কাছে উদয় কেন এত জনপ্রিয়
উদয় চরিত্রটির জনপ্রিয়তার পেছনে শুধু সংলাপ নয়, চরিত্রের বৈপরীত্যও বড় কারণ। সে একদিকে গ্যাংস্টার, অন্যদিকে বোনের প্রতি ভীষণ দায়িত্বশীল ভাই। বোনের ভালো বিয়ে দেওয়ার জন্য তার উদ্বেগ যেমন আছে, তেমনি নিজের অভিনয়ের স্বপ্নও রয়েছে।
উদয় ও মজনুর বন্ধুত্বও দর্শকদের কাছে আলাদা আবেদন তৈরি করেছে। তাদের ঝগড়া, ভয় পাওয়া এবং বিপদের সময় একে অন্যের পাশে দাঁড়ানোর বিষয়গুলো পরবর্তী সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা রসিকতার অংশ হয়েছে।
এ ছাড়া পরিবারের সম্মান, বিয়েতে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং আত্মীয়স্বজনের বিচার-বিশ্লেষণের মতো বিষয়গুলোও ‘ওয়েলকাম’-এর গল্পকে দর্শকদের কাছে সহজবোধ্য করেছে। প্রায় ২ ঘণ্টা ৪১ মিনিটের সিনেমাটিতে ছোট ছোট অসংখ্য দৃশ্য ও সংলাপ রয়েছে, যেগুলো আলাদাভাবেও দর্শকদের মনে জায়গা করে নিয়েছে।
২০১৫ সালে মুক্তি পাওয়া ‘ওয়েলকাম ব্যাক’-এও উদয় শেঠি চরিত্রে ফিরে আসেন নানা পাটেকার। ফলে নতুন প্রজন্মের দর্শকদের কাছেও চরিত্রটির পরিচিতি আরও দৃঢ় হয়।
চরিত্রটিকে হাসির পাত্র বানাননি নানা
কমেডিতে টাইমিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কখন সংলাপ বলতে হবে, কখন থামতে হবে কিংবা কখন শুধু একটি দৃষ্টিই যথেষ্ট—নানা পাটেকার উদয় চরিত্রে তার অসাধারণ নিয়ন্ত্রণ দেখিয়েছেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তিনি উদয়কে নিয়ে নিজে হাসেননি। বরং চরিত্রটিকে একজন সত্যিকারের গ্যাংস্টার হিসেবেই বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছিলেন। তার গম্ভীর অভিনয় এবং হাস্যকর পরিস্থিতির সংঘাত থেকেই তৈরি হয়েছে সিনেমার বড় অংশের হাসি।
নানা পাটেকারের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে শক্তিশালী ও গম্ভীর চরিত্রের সংখ্যা কম নয়। কিন্তু নতুন প্রজন্মের বহু দর্শকের কাছে তিনি হয়তো সেই ভয়ংকর অথচ মজার গ্যাংস্টার হিসেবেই সবচেয়ে বেশি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন—উদয় শেঠি, যে রেগে গেলে নিজেকেই বলতে হয়, ‘কন্ট্রোল উদয়!’
প্রতিবেদকের নাম 























